কবিতা: দেবনির্মাণ ( পাণ্ডুলিপি )

দেবনির্মাণ

চাই বাঞ্ছাকল্পতরু ভক্তজনদাতা,
নাই চাই নির্বিশেষ অমেয় বিধাতা—
গুণহীন পরমাত্মা, যাঁরে তর্কপটু দার্শনিক জ্ঞানী
ধরিতে ছুঁইতে নাহি পারে, তবু নিয়ে করে টানাটানি।
চাই দেব হেন শক্তিমান যার সনে চলে কারবার,
বিপদে সম্পদে বার বার যাঁর কাছে চলে আবদার —
মন্দ যা আছে ফিরে নাও,
শুভ যা আছে সব দাও,
তাহার উপরে কিছু ফাও
আরো দাও মোরে আরো দাও।।

ভূলোকে দ্যুলোকে তাই করিনু সন্ধান
কোথায় দেবতা যিনি বহুশক্তিমান।
জলে স্থলে মেঘলোকে নভে বিশ্বদেব তোমারে সম্ভাষি,
হে অনল-সলিল-বিহারী, হে ওষধি-বনস্পতি-বাসী—
বধিয়াছি মনোমত পশু মন্ত্রপূত যজ্ঞবেদী 'পরে,
ঢালিয়াছি হবির আহুতি, অগ্নিশিখা উঠিল অম্বরে,
দাও পুত্র ধন ধান্য ধেনু, দাও ব্রীহি শস্যের সম্ভার,
দূর কর অমঙ্গলভয়, শত্রু মোর করহ সংহার।
কৃষ্ণ ধূমে চক্ষু হয় নাশ,
সোমরসে হরিল চেতনা,
মেদগন্ধে না পড়ে নিঃশ্বাস,
দেখা দাও যজ্ঞের দেবতা!
কোথা ওহে বিশ্বদেবগণ?
হা বধির নভে অচেতন।।

হে অদৃশ্য দেব, এই মৃৎকণাতলে
ধরা নাহি দিবে তুমি মোর মন্ত্রবলে।
গড়িয়াছি বিপুল আয়াসে মন্ত্রবেদী তব নিকেতন,
পত্র পুষ্প ফল জল দিয়া করিয়াছি অর্ঘ্য নিবেদন,

রচিয়াছি বিস্ময়রচিতা দৃশ্যমান তব কলেবর
ধাতু শিলা কর্দমপ্রলেপে সুগঠিত মুরতি সুন্দর,
মণিময় নানা আভরণে সাজায়েছি বিগ্রহ তোমার,—
ওহে স্রষ্টা, হে সৃষ্টি মম, লভ পূজা লভ পুরস্কার।
আর যদি ওহে নিরাকার, নাহি চাও মুরতি সুডৌল,
আছে ঐ অবয়বহীন সু বর্তুল শিলা শালগ্রাম।
যেথা ইচ্ছা কর অধিষ্ঠান,
ধর ধর অর্ঘ্য উপহার,
কথা কও ওহে মূর্ত্তিমান,
মনোবাঞ্ছা পুরাও আমার।
হা রে মূক জড় ভগবান,
হা বিমুখ অচল পাষাণ।।

বুঝিয়াছি হে দ্যুলোকবাসী ভগবান,
মুরতি পূজায় শুধু তব অপমান।
নরূপী তব দূত মুখে পাইয়াছি বার্তা অভিনব,
মানবেরে করেছি দেবতা, দেবতারে করেছি মানব।
সব কথা নারিনু বুঝিতে, এইটুকু বুঝিয়াছি প্রভু—
নিজস্ব মোদের তুমি শুধু, অপরের নহ তুমি কভু।
ত্রাণ কর সন্তানে তোমার, স্বর্গলোকবাসী হে জনক,
প্রতিবেশী বিধর্মীর তরে দাও প্রভু অনন্ত নরক।
বীর যত তোমার সন্ততি
মত্ত নামি করিছে উল্লাস,
জয় জয় প্রভু গোষ্ঠীপতি—
এ কি দেব এ কি পরিহাস?
আজ বধ করিতে ভ্রাতায়,
তব রাজ্য রসাতলে যায়।।

(শুনিব না কোনো কথা অপরে যা কয়,
বিশ্বাসে তোমারে আমি লভিব নিশ্চয়।
তুমি সর্ব গুণের আধার, হে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান,
তুমি সর্বভয়পরিত্রাতা, হে অপার করুণানিধান।

পাইয়াছি তোমারি দয়ায় ধরাতলে ভাল কিছু যাহা,
মঙ্গল যা কিছু দিয়েছ আমারি উন্নতির তরে তাহা—
সে কেবল তব লীলাখেলা, অথবা সে মোর কর্মফল।
হে ঈশ্বর, নাহি কি হে তব আর কোনো উপায় সরল?
লুকোচুরি কর না ত আর যদি তুমি এত শক্তিমান।
ওহে শুষ্ক বাঞ্ছাকল্পতরু, গৃহস্থের পোষা ভগবান,
ভক্তি চায় ধরিতে তোমারে, যুক্তি কাটে তোমার বন্ধন,
হায় প্রভু টিকিলে না তুমি, সঁপিলেম হ'নু নিরীক্ষণ !
হে অক্ষম ভয়পরিত্রাতা, হে অথর্ব নিয়মের দাস,
হে দুর্বল মহাকর্ষণিক, হে নিষ্ঠুর শক্তির বিকাশ;
হে কৃত্রিম মানববিগ্রহ,
হে নরের বাঞ্ছিত বিধান,
এক চক্ষু মুদি অনুগ্রহ
কেমনে করিব তব ধ্যান ?

হে বিধাতা, পার নাই গড়িতে ঈশ্বর,
ফেলিয়াছ এই ভার আমার উপর।
অতি দীন আয়োজন মোর, তবু নাহি মানি পরাভব,
যুগে যুগে তিল তিল করি অসম্ভবে করিব সম্ভব।
হে অবুঝ, কর কিছু ব্যয়, দাও মোরে শ্রেষ্ঠ উপাদান —
মন-প্রাণ ধৈর্য নিরবধি, যথাসাধ্য করিব নির্মাণ।
আপনার সজল স্বভাব দেবতায় পাই বিপরীত,
সুন্দর যা কিছু আছে হেথা দেবতায় চাই সুরক্ষিত।
পঙ্কে তার দিতেছি লেপিয়া শ্রেয় শ্রেয় কল্পনা আমার,
দেবত্ব রচিবার ছলে মনুষ্যত্বে দিতেছি আকার।
এখনো অনেক ত্রুটি আছে, কেমনে সে দিবে ইষ্টফল ?
তবু আশা আছে ক্রমে হবে মনগড়া সুন্দর সবল।
সহস্র সে মানববিগ্রহ, খণ্ডে তার হেরেছি নূতন,
নানা পন্থে নানা দেশে কালে ; নমি সেই হস্ত-নারায়ণে।
সর্বশক্তি নাহি থাক তার,
তথাপি সে বলশক্তিমান।
না পারুক করিতে উদ্ধার,
তথাপি সে করুণানিধান।
নাহি হ'ক সর্বফলদাতা,
তবু তারে কহিব দেবতা ॥

(১৯৫১) ভারতবর্ষ, বৈশাখ, ১৩৫৪।