কবিতা: প্রার্থনা ( পাণ্ডুলিপি )

প্রার্থনা

ওহে অনন্ত বিশাল বিপুল নিখিলের অধিপতি,
বিশ্বে তোমার না পাই নাগাল মোরা অতি মূঢ়মতি।
মহাকুদরতের বিরাট ধান্দা ছেড়ে ক্ষণেকের তরে
অতি ছোট হয়ে ধরা দাও আজ মোদের ক্ষুদ্র ঘরে।
ভেবেছ এ ঘর বেশ তো সাজানো, কিসের অসদ্ভাব,
হায় হায় প্রভু বুঝিলে না এ যে ভাড়া করা আসবাব।
অন্তর্যামী, ভিতরের খবর কিছুই জানিলে না কি?
কোনো মতে ঠাট বজায় রেখেছি ভিতরে সকলি ফাঁকি।
এই যে দেখিছ রোগা রোগা যত অমৃতের সন্তান,
দারুণ দৈন্য লজ্জার চাপে কণ্ঠে আগত প্রাণ।
কবে কোন্ যুগে খেয়েছিনু মোরা দুই চার ফোঁটা সুধা,
হজম হইয়া গেছে কোন্ কালে পেয়েছি বিষম ক্ষুধা।
হাজার বছর সবুর করিয়া লভিয়াছি এই জ্ঞান—
নিজ হতে তুমি নাহি দিবে কভু ছাপ্পর ফোঁড়া দান।
ওহে হৃদীশ হৃষীকেশ, তাই সকলে তোমার কাছে
জবরদস্তি করিব আদায় যা কিছু অভাব আছে।
চল্লিশ কোটি নাছোড়বান্দা মোরা ছাড়িব না কভু,
তুমি যে একলা পড়িয়াছ ধরা, কোথায় পালাবে প্রভু?
ওঠো নারায়ণ, জাগ জাগ ওহে অচেতন শালগ্রাম,
এ নয় তোমার ক্ষীরোদসিন্ধু, এ যে গরিবের ধাম।
ওহে দামোদর, চল্লিশ কোটি টানিছে তোমার রশি,
ওঠো নারায়ণ ফাঁকি যে তোমার উত্থান-একাদশী।

অল্পে তুষ্ট ভক্ত আমরা, বেশী কিছু নাহি চাই,
অর্ধরাজ্য, রাজার কন্যা — এসবেতে রুচি নাই।
ইন্দ্রের পদ, কুবেরের ধন, স্বর্গের ভোগ যত
মুক্তি মোক্ষ নির্বাণ আদি তোলা থাক আপাতত।
যারে তারে যাহা দিয়েছ দেদার তাই দাও আমাদের—
একটি কেবল ছোটখাটো বর, তাতেই হইবে ঢের॥

খোল হে শীঘ্র খোল হে তোমার শান্তির ভাণ্ডার,
দাও হে মাথায় হৃদয়ে শান্তি বাহুতে শক্তি সার।
কর হে কোমল কুসুমের মত, তাতে আপত্তি নাই,
দরকার হলে বজ্রের মত কঠোরতা যেন পাই।
তৃণের চেয়েও কর হে সুনীচ, তরুর চেয়েও ধীর,
দুষ্কর কাজে উচ্চ যেন রয় হিমাচল সম শির।
যত খুশি দাও ক্ষমা অহিংসা এ ব্রতের মোর তরে,
একটি কেবল মনের বাসনা বলে রাখি হে শ্রীহরি—
দুর্জন অরি এক চড় যদি লাগায় আমারে কভু,
তিন চড় তবে কষাইয়া দিব, মাপ কর মোরে প্রভু।
একটি কাণের বদলে তাহার দিব দুই কাণ কাটি,
একটি দাঁতের বদলে তাহার উপাড়িব দুই পাটি।
ইষ্টানিষ্ট না ভাবিব কভু, শত্রু করিব চিট—
ক্ষম অপরাধ ওহে দয়াময়, আমি নরকের কীট॥

এইটুকু বর লইয়া তোমায় আপাতত দিব ছুটি,
নিজ নিজ ঘর দ্বার গুছাইয়া যত পারি মোটামুটি।
তার পরে যদি আসে হে সুদিন, মোরা যদি বেঁচে থাকি,
ভাল ভাল বর করিব আদায় যা কিছু রহিল বাকী—
মান সম্ভ্রম, মোটা রোজগার, তেতলা পাক্কা বাড়ী,
লোক-লস্কর, রূপসী বনিতা, আট-সিলিণ্ডার গাড়ী॥

(১৯২৬)
ভারতবর্ষ, আশ্বিন, ১৩৩৩।