শেষের মলাট

পিতৃদত্ত নামের উপর তর্ক চলে না কিন্তু স্বকৃত নামের যোগ্যতা বিচার করিবার অধিকার সমালোচকের আছে। পরন্তু অস্ত্রটা রূপধ্বংসকারীর, তাহা রূপসৃষ্টিকারীর নহে। পরশুরাম নামটা শুনিয়া পাঠকের সন্দেহ হইতে পারে যে লেখক বুঝি জখম করিবার কাজে প্রবৃত্ত। কথাটা একেবারেই সত্য নহে। বইখানি চরিত্র চিত্রশালা। মূর্ত্তিকারের ঘরে ঢুকিলে পাথর ভাঙার আওয়াজ শুনিয়া যদি মনে করি ভাঙা চোরাই তাঁর কাজ তবে সে ধারণাটা ছেলেমানুষের মত হয়,— ঠিকভাবে দেখিলে বুঝা যায় গড়িয়া তোলাই তাহার ব্যবসা। মানুষের সুবুদ্ধি বা দুৰ্ব্বুদ্ধিকে লেখক তাঁহার রচনায় আঘাত করিয়াছেন কিনা সেটা তো তেমন করিয়া আমার নজরে পড়ে নাই। আমি দেখিলাম তিনি মূর্ত্তির পর মূর্ত্তি গড়িয়া তুলিয়াছেন। এমন করিয়া গড়িয়াছেন যে, মনে হইল ইহাদিগকে চিরকাল জানি। এমন কি, তাঁর ভূষণ্ডীর মাঠের ভূতপ্রেতগুলোর ঠিকানা যেন আমার বরাবরকার জানা ; এমন কি, যে পাঁঠাটা কন্সটওয়ালার ঢাকের চামড়া ও তাহার দশটাকার নোটগুলো চিবাইয়া খাইয়াছে সেটাকে আমারই বাগানের বসুরাই গোলাপ গাছ কাঁটাসুদ্ধ খাইতে দেখিয়াছি বলিয়া স্পষ্ট মনে পড়িতেছে। লেখক বোধকরি আধুনিক রুদ্র তেজের দিনে নিজেকে বীরপুরুষের দলে চালাইয়া দিবার লোভ সামলাইতে পারেন নাই কিন্তু আমরা তাঁহাকে রসস্রষ্টার দলেই দাবী করি। ইহাতে বর্তমানে যদি তাঁহার কিছু লোকসান হয় সুদীর্ঘ ভাবীকলে তাহা পূর্ণ হইয়াও উদ্বৃত্ত থাকিবে।

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর