অবতরণিকা-অনন্তে

—অনন্তে

পরশুরাম-সাহিত্য ‘পরিমাণে’ অত্যন্ত কম হলেও (তাঁর একাধিকবারের উক্তি—হাত তুলে দেখিয়ে—‘সের দুই’!) প্রায় অনন্ত তার দিশা। অন্তেতও তার সম্বন্ধে অনন্ত কথা বাকী থাকে। “আজো তাই/ এ পথের শেষ নাহি পাই।/ ফূরালে এ পথ/পূর্ণ হবে সর্ব মনোরম...” । ১

আমি তার যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করছি। এটা রাজশেখর-জীবনী লেখার জায়গা নয়, কিন্তু তার কিছু খাপছাড়া ঘটনা জানলে এক বিপুল প্রতিভার সৃজনীশক্তির গভীর বহুমুখিতার পটভূমির কিছু আভাস পাওয়া যাবে।

চন্দ্রশেখর বসু ও লক্ষ্মীমাণ দেবীর দ্বিতীয় পুত্র রাজশেখরের জন্ম ৪ঠা চৈত্র ১৮৮৬, মঙ্গলবার ১৬ই মার্চ ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে, বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে, মাতুলালয়ে। মাতামহী জগন্মোহিনী দত্ত ছিলেন সেখানকার ‘দেবী চৌধুরাণী’। শৈশব থেকে কৈশোরের যাবতীয় লেখাপড়া চন্দ্রশেখরের কর্মস্থল বিহারের দ্বারভাঙ্গায়—হিন্দী মিডিঅমে। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত বাঙলা বলতে পারতেন না। বাঙলা শেখা তার পর। এর পর পাটনা, তার পর লেখাপড়ার শেষ কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কেমিস্ট্রিতে এম. এ., পরে বি. এল.। এরই মধ্যে (১৮৯৭) কলকাতার শ্যামাচরণ দে’র পৌত্রী, যোগেশচন্দ্র দে’র চতুর্থ কন্যা মৃণালিনীর সঙ্গে বিবাহ।

১৯০৩ সালে সার পি. সি. রায় নিয়ে গেলেন ১৯০১-এ তাঁর ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প-রূপে প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’-এ। ১৯০৪ থেকে ১৯৩২ সেখানকার ‘সর্বাধিনায়ক’ হয়ে বেঙ্গল কেমিক্যালকে করে তুললেন ভারতের সর্বোচ্চ দেশীয় রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান। এখানেই প্রকাশ পেল তাঁর প্রথম প্রতিভা—ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘ইনডস্ট্রিয়াল কেমিস্ট’। আর এখান থেকেই তাঁর দ্বিতীয় কীর্তি—সুহৃৎ যতীন্দ্রকুমার সেনের সঙ্গে ‘বাঙলা বিজ্ঞাপনের’ সার্থক রূপায়ন। আজকের অসংখ্য বিজ্ঞাপন সংস্থার সেই বীজ। এই প্রবর্তনের মাত্র অপর ব্যক্তিত্ব—সুকুমার রায়। পরবর্তীকালে রাজশেখর বহুবার বলেছেন—‘বাল্যের কবিতার পর এই বিজ্ঞাপন লেখাই আমার সাহিত্যের আরম্ভ।’

এরই মাঝে ১৯২২ সালে ‘মধ্যগগণের প্রখর রবিকরে’ প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম গল্প শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড। এতেই দেখা দিল তাঁর ছদ্মনাম—পরশুরাম, যা হাতের কাছে পাওয়া পারিবারিক স্বর্ণকার তারাচাঁদ পরশুরাম-এর নাম থেকে নেওয়া, যার সঙ্গে কুঠার-স্কন্ধ পৌরাণিক জামদগ্ন্য সম্পূর্ণ সম্পর্কবিবর্জিত। তখন এ এক অদ্ভুত সমাপতন।

১৯২৪-এর মধ্যে আরও চারটে গল্প নিয়ে প্রকাশিত হল পরশুরামের প্রথম গল্প-গ্রন্থ ‘গড্ডলিকা’। পাঠকমহলে সাড়া পড়েই ছিল, মধ্যাহ্ন রবিও (গ্রন্থের নামটি কিঞ্চিৎ ভুল উল্লেখ করে) লিখে ফেললেন এক দীর্ঘ প্রশংসাপত্র, যার সুবিখ্যাত উক্তি—“সকালে হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়া যদি দ্বারের কাছে দেখি মস্ত একটা বট গাছ...”।

সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হল প্রফুল্লচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের এক অপূর্ব ‘মসি যুদ্ধ’।

৮২৩

প্রফুল্লচন্দ্রের অভিযোগ—'আপনি আমার হাতে গড়া রাসায়নিকটির মাথা বিগড়াইয়া দিতেছেন। “...আর একটি তীব্র সমালোচনা করিয়া তাঁহাকে নিরস্ত্র করুন।...” রবীন্দ্রনাথের উত্তরে পাওয়া গেল আরও একটি ঐতিহাসিক উক্তি—“এই মানুষটি একেবারেই কেমিক্যাল গোল্ড নন, ইনি খাঁটি খনিজ সোনা।...” ২ কিন্তু সত্যিই এই খনিজ সোনাটিকে বাংলা ভাষার ‘বীন্’/‘বেকন্‌’ করছিল। আলোকস্তম্ভের হাতছানি। ১৯৩২-এ বেঙ্গল কেমিক্যালের ম্যানেজারের পদ ছেড়ে রাজশেখর নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেললেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে। বার বছর বয়সে প্রথম-বাংলা শেখা, পরে এক রসায়নবিদ ব্যবসায়ী হয়ে গেলেন বাংলা ভাষা সংস্কার ও পরিভাষা-কমিটির অধিনায়ক। তখনও ‘ডিরেষ্টর’ হয়ে বেঙ্গল কেমিক্যাল পরিচালনার সঙ্গে চলল বানান-সংস্কার, অভিধান সংকলন গল্প লেখা ও রামায়ণ মহাভারতের সারানুবাদ। ১৯৩৪-এ হঠাৎ এল তাঁর সবচেয়ে বড় আঘাত—একমাত্র সন্তান ‘প্রতিমা' ও জামাতা অমরনাথ পালিতের মৃত্যু। সেদিন শনিবার, ১৫ই এপ্রিল ১৯৩৪ : দীর্ঘ-রোগগ্রস্ত অমরনাথের মৃত্যুর প্রস্তুতি ছিল সকলেরই : কিন্তু অক্লান্ত শুশ্রুষাকারিণী পত্নী প্রতিমার সম্পূর্ণ আকস্মিক মৃত্যু এলপতির মৃত্যুকে নিশ্চিত ‘প্রত্যক্ষ’ করার সঙ্গে সঙ্গে। বিজয়িনী। কয়েকঘণ্টা পরে মৃত অমরনাথের দেহ উঠল পত্নীর জ্বলন্ত চিতায়। দুঃখ সুখে ব্যথিতচিত্তে সম্পূর্ণ বিগতস্পৃহ রাজশেখর নিবাত দীপশিখা। পরের দিনই ভোরে এই নিয়ে লিখলেন ‘সতী’ কবিতা : সদ্য পিতৃমাতৃহীনা একমাত্র দৌহিত্রী ‘আশা’কে (আমরা মা) সেটা দিয়ে বললেন স্বল্লতম কথা—‘লেখাপড়া নিয়ে থাক। বিদ্যের চেয়ে বড় আর কিছু নেই।’ ‘সতী’ তখন মা’র কাছে হয়ত ‘মৃত্যুর পরে’র চেয়েও। এ কবিতার মূল্যায়নও আমার সাধ্যাতীত। তবু বলতে পারি এ কবিতা সৃষ্টির পটভূমি, এর দর্শন ও তারপরের ওই স্বল্পতম উক্তিই রাজশেখরের সারাজীবনের কর্ম ও প্রতিভা ছাপিয়ে ওঠা মূল মন্ত্র। এর পর ঠিক ২৬ বছর বেঁচেছিলেন রাজশেখর। নিরন্তর সন্তান শোকাতুরা পত্নীর মৃত্যু হয়েছে ১৯৪২-এ। বিদ্যা ও কর্মের মধ্যে আরও মগ্ন হয়ে গেছেন তিনি। তবে এই প্রথম যেন পেয়েছেন এক সস্নেহ ‘রিল্যাকসেশন’—একমাত্র ক্ষুদ্র দৌহিত্রী-পুত্র—এই ‘উত্তম’ ‘আমি’। পরবর্তীকালের বিশ্বস্ত সচিব। বেঙ্গল কেমিক্যাল পরিচালনা করে চলেছেন। বাংলা বানান সংস্কারের কর্ণধার হয়েছেন। সুরেশচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে, যতীন্দ্রকুমার সেন সহ সৃষ্টি করেছেন বাংলা লাইনো টাইপ। সাহিত্য সৃষ্টি তো চলেইছে। পরশুরামই সম্ভবত একমাত্র লেখক যাঁর লেখনীতে সর্বকালের সর্বোচ্চ ডিটেকটিভ - দ লাস্ট কোর্ট অভ আপীল—শার্লক হোমস জীবনে একবারই ভারতে এসেছেন ও বাঙলার এক অখ্যাত গ্রাম্য স্কুলটিচার রাখাল মুস্তাফীর কাছে প্রায় পরাস্ত হয়েছেন (নীলতারা গল্পে)। রাখাল মুস্তাফী যেন আর এক প্রোফেসর মটিআটি। এটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা নয়। অত্যন্ত রাশভারি রাজশেখরের ভাবলেশহীন মুখভঙ্গি ও ততোধিক ‘মৃত’ চোখের চাহনির আড়ালে যে

চিরন্তন ‘হোম্সীয়’ পর্যবেক্ষণ শক্তি লুকিয়ে ছিল, সেই তাঁর জীবনব্যাপী লোক- চরিত্র প্রকাশের উন্মোচনের উৎস। একমাত্র তাঁর পত্নী মৃণালিনীই তাঁর এই শক্তি সম্বেদ্ধে বারবার অতি সরল বাংলায় বলেছেন— ‘বড় ধড়িবাজ, কারুর (বিশেষতঃ মেয়েদের!) দিকে চোখ তলে তাকায় না, কিন্তু তাদের হাড়হদ্দ সব জানে। আমিও অবশ্য তাঁর এই হোম্সীয় শক্তি অনেকবার দেখেছি। দীর্ঘ জীবৎকালে অতি সাধারণ ব্যক্তি থেকে উচ্চ বুদ্ধিজীবী মহলের সংখ্যাতীত ব্যক্তির অপরিসীম শ্রদ্ধা পেয়েছেন রাজশেখর—সঙ্গে অনিবার্য ‘আক্রমণ’ও। এটা তো সভ্যতার আদি থেকে সত্য। বিশাল প্রতিভা দেখা দিলে দূরন্ত বাধাই যেন তার স্বীকৃতি। বিদ্যাসাগর তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথকেও সহ্য করতে হয়েছে বিস্তর নোংরামি। সেই বিরাট পুরুষদের মতনই নির্বিকার নিজের পথে এগিয়ে গেছেন রাজশেখর। ‘মৃত্যু’ ছাড়া আর কারুর সঙ্গে আপোষ নয়। ধীরে ধীরে তাঁর লেখা হয়ে উঠেছে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাণিত ব্যঙ্গ— satire—সরসতা ও কৌতুকের মধ্যে প্রচ্ছন্ন তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। অতি কঠিন বর্মের মতন দুর্ভেদ্য তাঁর এই রঙের নির্মোক আর এই কারণেই—যার জন্যে রাজশেখর নিজেই দায়ী—মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবী ছাড়া, সর্বসাধারণ তাঁর রঙের শুগার কোটিংটাকেই শুধুমাত্র উপভোগ করে তাঁকে ‘রসসাহিত্যিক’ ‘হাসির গল্প লেখক’ ইত্যাদি ‘খেতাব’ দিয়েছেন। নিজের সম্বন্ধে এই একটিমাত্র বিষয়ে তাঁকে বারবার বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখেছি— ৩৪।৩৫ বছর হয়ে গেছে, পরিষ্কার মনে আছে প্রতিটি শব্দ— “এটা অত্যন্ত অপমানকর, ‘রসসাহিত্যিক’ আবার কি, আমি কি হাড়িতে রস ফুটিয়ে তৈরী করি।” অবশ্য বেশ কিছু ব্যক্তি সরসতার আড়ালে এই satire-এর তীক্ষ্ণতা ঠিকই উপলব্ধি করেছেন। কিন্তু তাঁরাও বারবার বলেছেন যত তীক্ষ্ণই হোক, কখনও তা কাউকে আঘাত দেয় নি। এইখানে আমার নিতান্তই সুযোগ—‘প্রিভিলেজ’-এর গুরুত্বপুর্ণতা দাবী করতে পারি। আমার জ্ঞানোদয় থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত নিরন্তর সান্নিধ্যের বিশেষ সুযোগ। তাছাড়া অসংখ্যবার আমার কাছে বলে ফেলা রাশভারি রাজশেখরের অনেক একান্ত উক্তি, আমার বহু আপাত তুচ্ছ বিষয়ে গভীর স্মরণশক্তি, আমার বয়স ও তাঁর লেখা বারবার পড়া, এই সব মিশিয়ে এত বছর পরে আমার বিশ্বাস ‘কখনও তা কাউকে আঘাত দেয় নি’—বুদ্ধিজীবীদের এই উক্তি সর্বাংশে ঠিক নয় : হয়তো তাঁরাও খেয়াল করেন নি, অথবা খুব সম্ভবতঃ করেও ভদ্রতার খাতিরে এই নম্র উক্তি করেছেন। আমার উপলব্ধি—শুধুমাত্র আঘাতই দেন নি, বহুবার, বিশেষতঃ মানবসভ্যতার সমস্ত কুসংস্কার পাপ ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে আঘাতের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর লেখা নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার রাজত্বে প্রবেশ করেছে। অথচ রাজশেখরের অন্য এক সত্তা, ‘যথার্থ ভদ্রলোক’, তাঁর প্রশ্নাতীত শিষ্টাচার বারবার বাধা দিয়েছে এই নিষ্ঠুরতা এই নৃশংসতাকে। তখন তিনি তা প্রচ্ছন্ন করেছেন চরম থেকে চরমতর অস্পষ্টতার মধ্যে। বুঝে যে জন জান সন্ধান। সাধারণ তো বটেই, অসাধারণও যদি সেই গভীরে প্রবেশ করতে না পেরে তাঁর রঙের নির্মোক নিয়ে মাতামাতি করে তবে তার জন্যে দায়ী তিনি নিজে।

শুধু তাই নয়, আরও আছে। বোধ হয়, বোঝা না বোঝার একটা লুকোচুরি খেলার জন্যে মাঝে মাঝে বেশ স্থূল ব্যঙ্গও সৃষ্টি করে রেখেছেন অনেক লেখায় ; অবশ্যই সেটা অলঙ্কারের একটা অঙ্গ। কিন্তু ‘বিভ্রান্তি’ ত তাহলে আসবেই।

সবশেষে একবার ফিরে যাওয়া যাক তাঁর সৃষ্টির আদিতে, ১৯২২ সালে হাতের কাছে হঠাৎ পাওয়া স্বর্ণকার তারাচাঁদ পরশুরামের নাম থেকে নেওয়া রাজশেখর বসুর ছদ্মনাম ‘পরশুরাম’ তখন এক সামান্য ঘটনা : কিন্তু এক বিরাট সমপতন। পরবর্তীকালে, বয়স অভিজ্ঞতা মানসিকতা পারিপার্শ্বিকতা তাঁর লেখনীকে ক্ষুরধার করে ধীরে ধীরে তাঁকে করে তুলল এক ‘চিরঞ্জীব’ পৌরাণিক জামদগ্ন্য, যাঁর স্কন্ধস্থিত শাণিত কুঠার সমাজ ও সভ্যতার সমস্ত দোষ, evil, সামাজিক ও মানসিক কুসংস্কারকে নির্মম সংহারের জন্য সর্বদাই উদ্যত।

পণ্ডিতেরা তর্ক তুলুন, আমাকে মূর্খ বলুন, কিন্তু হয়ত রবীন্দ্রনাথ কৃত সংজ্ঞা অনুসারে ‘যার সব কিছু পণ্ড হয়ে গেছে’ সেই ‘পণ্ডিত’—আমিও পরশুরাম-সাহিত্য সম্বন্ধে এই ধারণা, এই বিশ্লেষণ, এই অবতরণিকা।

দীপঙ্কর বসু

১. বাদল সরকার।