গড্ডলিকা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

বইখানির নাম “গড্ডলিকা প্রবাহ।” ভয় ছিল পাছে নামের সঙ্গে বইয়ের আত্ম-পরিচয়ের মিল থাকে, কেননা সাহিত্যে গড্ডলিকা প্রবাহের অন্ত নাই। কিন্তু সহসা ইহার অসামান্যতা দেখিয়া চমক লাগিল। চমক লাগিবার হেতু এই যে, এমন একখানি বই হাতে আসিলে মনে হয় লেখকের সঙ্গে দীর্ঘকালের পরিচয় থাকা উচিত ছিল। সকালে হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়া যদি দ্বারের কাছে দেখি একটা উইয়ের ঢিবি আশ্চর্য্য ঠেকে না, কিন্তু যদি দেখি মস্ত একটা বট গাছ তবে সেটাকে কি ঠাহরাইব ভাবিয়া উঠা যায় না। লেখক পরশুরাম ছদ্মনামের পিছনে গা ঢাকা দিয়াছেন। ভাবিয়া দেখিলাম, চেনা লোক বলিয়া মনে হইল না, কেননা লেখাটার উপর কোনো চেনা হাতের ছাপ পড়ে নাই। নূতন মানুষ বটে সন্দেহ নাই কিন্তু পাকা হাত।

পিতৃদত্ত নামের উপর তর্ক চলে না কিন্তু স্বকৃত নামের যোগ্যতা বিচার করিবার অধিকার সমালোচকের আছে। পরন্তু অস্ত্রটা রূপধ্বংসকারীর, তাহা রূপসৃষ্টিকারীর নহে। পরশুরাম নামটা শুনিয়া পাঠকের সন্দেহ হইতে পারে যে লেখক বুঝি জখম করিবার কাজে প্রবৃত্ত। কথাটা একেবারেই সত্য নহে। বইখানি চারুচিত্রশালা। মূর্ত্তিকারের ঘরে ঢুকিলে পাথর ভাঙার আওয়াজ শুনিয়া যদি মনে করি ভাঙা চোরাই তাঁর কাজ তবে সে ধারণাটা ছেলেমানুষের মত হয়।—ঠিকভাবে দেখিলে বুঝা যায় গড়িয়া তোলাই তাঁহার ব্যবসা। মানুষের সুবুদ্ধি বা দুৰ্ব্বুদ্ধিকে লেখক তাঁহার রচনায় আঘাত করিয়াছেন কিনা সেটা তো তেমন করিয়া আমার নজরে পড়ে নাই। আমি দেখিলাম তিনি মূর্ত্তির পর মূর্ত্তি গড়িয়া তুলিয়াছেন। এমন করিয়া গড়িয়াছেন যে মনে হইল ইহাদিগকে চিরকাল জানি। এমন কি তাঁর ভূশণ্ডীর মাঠের ভূতপ্রেতগুলোর ঠিকানা যেন আমার বরাবরকার জানা : এমন কি, যে পাঁঠাটা কন্সার্টওয়ালার ঢাকের চামড়া ও তাহার দশটাকার নোটগুলো চিবাইয়া খাইয়াছে সেটাকে আমারই বাগানের বস্্রাই গোলাপ গাছ কাঁটাসুদ্ধ খাইতে দেখিয়াছি বলিয়া স্পষ্ট মনে পড়িতেছে। লেখক বোধকরি আধুনিক রুদ্র তেজের দিনে নিজেকে বীরপুরুষের দলে চালাইয়া দিবার লোভ সামলাইতে পারেন নাই কিন্তু আমরা তাঁহাকে রসস্রষ্টার দলেই দাবী করি। ইহাতে বর্তমানে যদি তাঁহার কিছু লোকসান হয় সুদীর্ঘ ভাবীকালে তাহা পূর্ণ হইয়াও উদ্বৃত্ত থাকিবে।

লেখার দিক হইতে বইখানি আমার কাছে বিস্ময়কর। ইহাতে আরো বিস্ময়ের বিষয় আছে সে যতীন্দ্রকুমার সেনের চিত্র। লেখনীর সঙ্গে তুলিকার কী চমৎকার জোড় মিলিয়াছে, লেখার ধারা রেখার ধারের সমান তালে চলে। কেহ কাহারও চেয়ে খাটো নহে। চরিত্রগুলো ডাহিনে বামে এমন করিয়া ধরা পড়িয়াছে যে, তাহাদের আর পলাইবার ফাঁক নাই।

গ্রন্থ সমালোচনার দাবী আমার কাছে প্রায় আসে। রক্ষা করিতে পারি না। লেখা আমার পছন্দ হয় না বলিয়া নয়, কৰ্ম্মবন্ধনের পাক পাছে বাড়িয়া যায় এই ভয়ে। আজ ঝোঁকের মাথায় নিয়ম ভঙ্গ করিয়া ভীত হইলাম। ভূশণ্ডীর মাঠে একদা আমার যখন গতি হইবে তখন প্রেতদের সঙ্গে আমার কীভাবের বোঝাপড়া ঘটিবে পরশুরামের উপর তাহার রিপোর্টের ভার রহিল কিন্তু যতীন্দ্রকুমারের কাছে দরবার এই যে আমার প্রেতশরীরের প্রতিপত্তির প্রতি মসীলৈপন সম্বন্ধে করুণ ব্যবহার করিবেন।

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর