বক্তব্য (দীপঙ্কর বসু)
গল্প-সমগ্র বা সংগ্রহ, যে লেখকেরই হোক, হাতে পেলে প্রায় কোনো পাঠকই তার 'ভূমিকা' পড়ায় আগ্রহী হন না, অনর্থক 'বিদ্যে-জাহির' মনে করেন। এটাই স্বাভাবিক। আর 'পরশুরাম'-এর গল্প—বারবার পড়েও ত তা প্রায় অনাদি অনন্ত। 'ভূমিকা' কি হবে।
তবু বারবার পড়ার ফাঁকে শ্রীপ্রমথনাথ বিশীর অপূর্ব ভূমিকাটি পড়লে এই অনাদি অনন্তের একটি চমৎকার দিশা পাওয়া যাবে।
কিন্তু অনন্ত সম্বন্ধে তারপরও অনন্ত কথা বাকী থাকে। আমি তার যৎকিঞ্চিৎ বলেছি এই গ্রন্থের শেষে, 'উপসংহার'-এ।
আপাততঃ আমি কেবল পরশুরাম/রাজশেখর বসুর সমগ্র রচনা ও তার প্রকাশ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা লিখছি।
রাজশেখর বসুর জীবৎকালে তাঁর স্বনামে প্রকাশিত হয়েছিল দশটি গ্রন্থ—চলন্তিকা (অভিধান), রামায়ণ, মহাভারত (সারানুবাদ), কুটিরশিল্প, ভারতের খনিজ, কালিদাসের মেঘদূত, হিতোপদেশের গল্প (ছোটদের) ও তিনটি প্রবন্ধ-সংকলন-লঘুগুরু, বিচিন্তা, চলচ্চিন্তা।
পরশুরাম নামে প্রকাশিত হয় মোট সাতানব্বইটি গল্প নিয়ে নখানি গ্রন্থ।
কয়েকটি কবিতা নিয়ে 'পরশুরামের কবিতা' ও 'শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা' মরণোত্তর প্রকাশ।
আরও পরে (১৯৬১) এই নখানি গল্পগ্রন্থ, তিনটি প্রবন্ধ সংকলন ও একটি কবিতার বই নিয়ে তিন খণ্ডে পরশুরাম গ্রন্থাবলীর প্রকাশ, যাতে সংযোজিত হয়েছিল তাঁর লেখা শেষ গল্প 'জামাইষষ্ঠী' (১৫. ৬. ১৯৬১-এ লেখা আরম্ভ কিন্তু অসমাপ্ত) ও তাঁর জীবনের সর্বশেষ রচনা 'রবীন্দ্রকাব্যবিচার'। এর কথা পরে বলছি।
এরও পরে খুঁজে পাওয়া গেল আর দুটি গল্প 'আমের পরিণাম' ও 'আনন্দ মিস্ত্রী'। প্রথমটি তাঁর নিজস্ব ভাষা-শৈলীতে কথিত হলেও ও 'সচিত্র ভারত' পত্রিকায় একবার প্রকাশ করলেও সম্ভবতঃ একটি প্রচলিত উপকথা হওয়ার জন্যই তাঁর কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত করেন নি। দ্বিতীয়টি ১৩৬১'র (১৯৫৪) শারদ গল্প-ভারতী-তে প্রকাশিত কিন্তু কোনো গ্রন্থে প্রকাশ না করার কারণ অজ্ঞাত। রাজশেখর একবার বলেছিলেন, "আমি সাধারণ লোকসমাজে বেশী মিশিনি, তার চেয়ে ঢের মিশেছি মিস্ত্রীদের সঙ্গে, কারখানায় কাজের সময়। 'ভূষণ পাল' গল্পের সূত্র অনেকটা সত্যি, সেখান থেকেই পাওয়া। আরও একটা গল্প এবিষয়ে লিখেছি, কিন্তু ছাপিনি; কারণ তাদের সংসার সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না।"
আনন্দ-মিস্ত্রী এই 'মিস্ত্রীদের সংসার' নিয়েই গল্প। এটাই কি তাঁর সেই 'না-ছাপা' রহস্যময় গল্প? হয়তো উপেন গাঙ্গুলিমশায়ের নির্বন্ধাতিশয় একবার গল্প-ভারতী-তে দিয়ে ছিলেন। জানি না।
এখন রাজশেখর বসুর মৃত্যুর বত্রিশ বছর পরে পূর্বোক্ত নখানি গল্প-গ্রন্থের সাতানব্বইটি গল্প ও শেষ অসমাপ্ত গল্পসহ আরও তিনটি—এই একশটি গল্পের অখণ্ড ও সম্পূর্ণ পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হল।
অবশ্য 'গল্প-সমগ্র' নাম সত্ত্বেও এতে তাঁর প্রায় সমগ্র কবিতাও অন্তর্ভূক্ত হল। এতে নামের 'ব্যাকরণ-ভুল' হলেও কারণ প্রাঞ্জল। শুধু 'পরশুরাম-সমগ্র' নাম হলে
অসংখ্যজন কৈফিয়ৎ চাইতেন, 'এতে রামায়ণ-মহাভারত নেই কেন?' (কেউ কেউ আরও জানতে চাইতেন 'আচ্ছা এতে চলন্তিকাটাও থাকছে ত?')
এর উত্তর—রাজশেখর বসুর স্বনামে রচিত সব গ্রন্থ বাদ দিয়ে শুধু 'পরশুরাম' নামে লেখা যাবতীয় রচনা নিয়েই—যা শুধুই গল্প—এই 'সমগ্র'। (আমার শৈশবে অনেকবার বলতে শুনেছি—'আমি যখন ঠাট্টা করে কিছু লিখি তখন 'পরশুরাম' বলে লিখি; আর যখন 'গম্ভীর' হয়ে লিখি তখন নিজের নামে লিখি'।)
কিন্তু তাহলে 'কবিতা' কোথায় যাবে? সেতো সবই স্বনামে লেখা। তবে 'প্রবন্ধ-সংগ্রহ' বা রামায়ণ-মহাভারত, এমনকি 'চলন্তিকা'-র সঙ্গেও কবিতা দেওয়া যায় না। বরং কবিতা গল্পেরই সমগোত্রীয়। তাই গল্প-সমগ্রেই স্থান পেল কবিতা।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম একমাত্র 'রবীন্দ্রকাব্যবিচার' প্রবন্ধ। রবীন্দ্রজীবনের শেষ সতের বছর (১৯২৪-৪১) তাঁর একান্ত স্নেহধন্য রাজশেখরের জীবনের এটি সর্বশেষ রচনা! এ এক অদ্ভুত সমাপতন। রবীন্দ্র-শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই প্রবন্ধ লেখার আরম্ভ ১৭-৪-৬০। অসুস্থ রাজশেখর এটি শেষ করেন ২৬-৪-৬০এ। পরদিন বুধবার, ২৭-৪ সকালে একটি অসমাপ্ত 'ফেয়ার কপি'ও করে রাখেন। তার কয়েক-ঘণ্টা পরেই নিঃশব্দ মৃত্যু। মৃত্যুর কিছু আগে এই শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলির সংযোজন—গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। রাজশেখর বসুর প্রবাদ হয়ে যাওয়া হস্তাক্ষর, জীবনের শেষ দিনে—যতই খারাপ হয়ে যাক।
* * *
শেষে সম্পাদকের 'কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপন' দস্তুর। কিন্তু আমি নিরুপায়, আমি কারও কাছে কোনো সাহায্য পাইনি, বাধাও পাইনি—তাই কৃতজ্ঞতা বা হিংসা প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই; স্তুতি বা নিন্দা দুটোতেই আমার সমান অধিকার। ব্যতিক্রম অবশ্য একমাত্র শ্রীসুপ্রিয় সরকার। তাঁর নিরন্তর তাগিদের ফলেই এই বিশাল কাজ সম্ভব হল।
এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের কথা এই সূত্রে বারবার মনে পড়ছে। সৈয়দ মুজতবা আলী। যিনি পরশুরামকে বলেছিলেন 'আপনার সমস্ত পাণ্ডুলিপি যদি হারিয়ে যায় আমাকে বলবেন, আমি স্মৃতি থেকে সমস্ত লিখে দোব।' পরশুরামের মৃত্যুর পরই আমাকে লিখেছিলেন—'হঠাৎ যেন চোখের সামনে একটা বিরাট সমুদ্র শুকিয়ে গেল।' এই দিয়ে আরম্ভ চিঠিটির শেষ—'আমি পৃথিবীর কোনো সাহিত্য আমার পড়া থেকে বড় একটা বাদ দিইনি। রাজশেখরবাবু যে কোনো সাহিত্যে পদার্পণ করলে সে সাহিত্য ধন্য হত। একথা বলার অধিকার আমার আছে।'
এবং আরও পরে মুজতবা আলী বলেছিলেন, 'রাজশেখর বাবুর গ্রন্থাবলী প্রকাশ হলে যেন আমি ছাড়া আর কেউ তা সম্পাদনা না করে।'
হয়ত তা দুই জ্যোতিষ্কের মহাকাশ সম্মিলন হত। আজ তাঁরা কতদূরে। সত্যি সত্যিই 'উজ্জ্বল মহাকাশের বিপুল পরিসীমায়' নক্ষত্রে নক্ষত্রে মহাসম্মিলনে ব্যস্ত।
তাঁদের সকলের ইচ্ছা পূর্ণ হোক।
দীপঙ্কর বসু,