প্রফুল্লচন্দ্রের নালিশ

শ্রদ্ধাস্পদেষু,

শেষ বয়সে আপনাকে লইয়া বড়ই মুস্ফিলে পড়িলাম। চরকার সপক্ষে বিপক্ষে যাহাই লিখুন না কেন তাহাতে বরং সমাজের উপকারই ; এ বিষয়ে যত বাদানুবাদ হয় ততই ভালো। এই প্রবন্ধের সপক্ষে বিপক্ষে অনেকেই লেখনী ধারণ করিয়াছেন ; ইদানীং মহাত্মা গান্ধীও আসরে অবতীর্ণ হইয়াছেন। আমি অনেক সভায় বলি, যখন “বড়-দাদা” আমাদের দিকে, তখন “ছোট-দাদা”কে ভয় করি না—সে দিন আপনার সামনে হিসাব করিয়া দেখিলাম আপনি আমার অপেক্ষা তিন মাসের বয়োজ্যেষ্ঠ।

সম্প্রতি দেখিতেছি আপনি সত্য সত্যই আমার ক্ষতি করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। “গড্ডলিকার” প্রথম সংস্করণ বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। কিন্তু যখন দেখি সাহিত্যসম্রাট্ স্বয়ং তাহার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তখন অচিরে পর পর বারো হাজার কপি সে বিক্রয় হইবে তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। সেদিন গ্রন্থকার পরশুরামকে আমি বলিলাম, এ-প্রকার সৌভাগ্য কদাচিৎ কোনো লেখকের ঘটিয়া থাকে। এখন তাঁহার মাথা না বিড়াইয়া যায়। তিনি আমারই হাতের তৈরী একজন রাসায়নিক এবং আমার নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ কার্যে অনেকদিন যাবৎ ব্যাপৃত। কিন্তু এখন তিনি বুঝিলেন যে তিনি সাহিত্যক্ষেত্রেও একজন “কেষ্ট-বিষ্টু”! সুতরাং আমাকে অসহায় রাখিয়া ত্যাগ করিতে ইচ্ছুক হইতে পারেন!

আর-একটি কথা!—আপনি তো এগারো-বারো বৎসর বয়স হইতেই কবিতা লিখিতেছেন। শুনিয়াছি ঈশ্বর গুপ্ত তিন বৎসর বয়সেই পদ্য রচনা করিয়াছিলেন এবং পোপ নাকি কিশোর বয়সেই বলিয়াছিলেন— Father father mercy take I shall no more verses make !

অনেকে বলিয়া থাকেন যে চল্লিশ বৎসরের পর নূতন ধরণের কিছু কেহ রচনা করিতে পারেন না ; কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখিয়াছি নিউটন ৪৩।৪৪ বৎসর বয়সের পূর্বেই অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন ; কিন্তু গ্যালিলিও সেই বয়স হইতে আরম্ভ করিয়া পর পর যুগান্তরসংগঠনকারী আবিষ্কার করেন ; আবার (Schumann) শুম্যান পঞ্চাশ বৎসর বয়সের পরে জড়-বিজ্ঞানের নূতন আবিষ্কারের দ্বারা জগৎকে চমৎকৃত করেন। রিচার্ডসন (Father of English novelists) পুস্তকবিক্রেতা ছিলেন এবং আমার যেন স্মরণ হইতেছে, যখন পঞ্চাশ বৎসরের কাছাকাছি তখন তিনি নভেল লিখিতে হাত দেন। আমাদের পরশুরামও প্রায় ৪৩।৪৪ বৎসর বয়সে লিখিতে আরম্ভ করিয়াছেন। আসল কথা এই যে আপনাকে কি অনুরোধ করিব যে আর-একটি এমন তীব্র সমালোচনা করুন যে, পরশুরামের হাত হইতে কুঠার খসিয়া পড়ে? এক সময় পড়িয়াছিলাম যে অনেক তত্ত্ব ও শক্তি গুহায় নিহিত থাকে ; কিন্তু ভগবানের লীলা কে বুঝিবে, কাহাকে কখন গুপ্ত অবস্থা হইতে সুপ্রকাশ করিয়া তুলেন।

ভবদীয়
শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র রায়