প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ

প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ

ওঁ

শান্তিনিকেতন

সুহৃদ্ববর, বসে বসে Scientific American পড়ছিলুম এমন সময় চিঠির খামের কোণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানসরস্বতীর পদাঙ্ক দেখতে পেয়ে সন্দেহ হল আমার হৃৎপদ্ম থেকে কাব্যসরস্বতীকে বিদায় করে তিনি স্বয়ং আসন নেবেন এমন একটা চক্রান্ত চলছে। খুলে দেখি যাকে ইংরেজিতে বলে টেবিল ফেরানো—আমারই পরে অভিযোগ যে, আমি রসায়নের কোঠা থেকে ভুলিয়ে ভদ্রসন্তানকে রসের রাস্তায় দাঁড় করাবার দুষ্কর্মে নিযুক্ত। কিন্তু আমার এই অজ্ঞানকৃত পাপের বিরুদ্ধে নালিশ আপনার মুখে শোভা পায় না ; একদিন চিত্রগুপ্তের দরবারে তার বিচার হবে। হিসাব করে দেখবেন কত ছেলে যারা আজ পেটমোটা মাসিকপত্রে ছোটগল্প আর মিলহারা ভাঙা ছন্দের কবিতায় সাহিত্যলোকে একেবারে কিষ্কিনধ্যাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে পারত, এমন কি লেখাদায়গ্রস্ত সম্পাদকমণ্ডলীর আশীর্বাদে যারা দীপ্তশিখা আলোচনায় লঙ্কাকাণ্ড পর্যাত্ত বড় বড় লাফে ঘটিয়ে তুলত, তাদের আপনি কাউকে বি. এসসি, কাউকে ডি. এসসি-লোকে পার করে দিয়ে ল্যাবরেটরির নির্জন নিঃশব্দ সাধনায় সন্ন্যাসী করে তুললেন। সাহিত্যের তরফ থেকে আমি যদি তার প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করে থাকি কতটুকুই বা কৃতকার্য হয়েছি। আপনার রাসায়নিক বন্ধুটিকে বলবেন মাসিকপত্রবলে যে সব জীবাত্মা হয়ত বা সাহিত্যবীর হতে পারত ভূষণ্ডীর মাঠে তাদের অঘটিত সম্ভাবনার প্রেতগুলির সঙ্গে আপনার মোকাবিলার পালা যেন তিনি রচনা করেন।

আমার কথা যদি বলেন—আপনার চিঠি পডে আমি অনুতপ্ত হইনি ; বরঞ্চ মনের মধ্যে একটু গুমর হয়েছে। এমন কি ভাবছি স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মতো শুদ্ধির কাজে লাগব, যে সব জন্মসাহিত্যিক গোলমালে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে জাত খুঁইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাঁদের ফের একবার জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন, কিন্তু আপনার আর বোধ হয় উদ্ধার নেই। যাই হোক আমি রস যাচাইয়ের নিকষে আঁচড় দিয়ে দেখলেম আপনার বেঙ্গল কেমিক্যালের এই মানুষটি একেবারেই কেমিক্যাল গোল্ড নন, ইনি খাঁটি খনিজ সোনা।

এ অঞ্চলে যদি আসতে সাহস করেন তাহলে মোকাবিলায় আপনার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করা যাবে।

ইতি ১৮ অঘ্রান ১৩৩২

আপনার
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৮২২