নীল তারা ইত্যাদি গল্প: শিবমুখী চিমটে

শিখামুখী চিমটে

ঝিন্টুর মুখ থেকে থার্মমিটার টেনে নিয়ে তার মা বললেন, নিরেনব্বই পয়েন্ট চার। আজ রাত্তিরে শুধু দুধবার্লি খাবি। ঘুরে বেড়াবি না, এই ঘরে থাকবি। আমাদের ফিরতে কতই আর দেরি হবে, এই ধর রাত বারোটা।

ঠোঁট ফুলিয়ে ঝিন্টু বলল, বা রে, তোমরা সকলে মজা করে মাদ্রাজী ভোজ খাবে আর আমি একলাটি বাড়িতে পড়ে থাকব, হুঃ—

—আরে রাম বল, ওকে কি ভোজ বলে! মাছ নেই, মাংস নেই, শুধু তেঁতুলের পোলাও, লঙ্কার ঝোল, আর টক দই। যজ্ঞস্বামী আয়ার ওঁর অফিসের বড় সাহেব, তাঁর মেয়ের বিয়ে, আর আয়ার-গিন্নীও অনেক করে বলেছে, তাই যাচ্ছি। তোর জন্যে এই মেকানো রইল, হাওড়া ব্রিজ তৈরি করিস। সুকুমার রায়ের তিনখানা বই রইল, ছবি দেখিস। কিন্তু বেশী পড়িস নি, মাথা ধরবে। তোর পিসীকে বলে যাচ্ছি রাত সাড়ে আটটায় দুধবার্লি দেবে। খেয়েই শুয়ে পড়বি। পিসী তোর কাছে শোবে।

—না, পিসীমাকে শুতে হবে না। তার ভীষণ নাক ডাকে, আমার ঘুম হবে না। আমি একলাই শোব।

—বেশ, তাই হবে।

ঝিন্টুর বয়স দশ, লেখাপড়ায় মন্দ নয়, কিন্তু অত্যন্ত চঞ্চল আর দুরন্ত। তার মা বাবা আর ছোট বোন নিমন্ত্রণ খেতে গেল আর সে একলা বাড়িতে পড়ে রইল, এ অসহ্য। একটু জ্বর হয়েছে তো কি হয়েছে? সে এখনই দু মাইল দৌড়তে পারে, ব্যাডমিন্টন খেলতে পারে, সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে তেতলার ছাতে উঠতে পারে। বাড়িতে গল্প করারও লোক নেই। পিসীমাটা যেন কি, দুপুর বেলা আপিসে যায় আর সকালে বিকেলে রাত্তিরে শুধু নভেল পড়ে। ঝিন্টুর ক্লাসফ্রেন্ড জিতুর পিসীমা কেমন চমৎকার বুড়ো মানুষ, কত রকম গল্প বলতে পারে। জিতু বলে, হ্যাঁরে ঝিন্টু, তোর সরসী পিসী সেজেগুজে আপিস যায় কেন? মালা জপবে, বড়ি দেবে, নারকেলনাড়ু আমসত্ত্ব কুলের আচার বানাবে, তবে না পিসীমা!

মেকানো জোড়া দিয়ে ঝিন্টু অনেক রকম ব্রিজ করল, আবার খুলে ফেলল। সাড়ে আটটার সময় সরসী পিসী তাকে দুধবার্লি খাইয়ে বলল, এইবার ঘুমিয়ে পড় ঝিন্টু।

ঝিন্টু বলল, সাড়ে আটটায় বুঝি লোকে ঘুমোয়? তুমি তো অনেক বই পড়, তা থেকে একটা গল্প বল না।

সরসী উত্তর দিল, ওসব গল্প তোর ভাল লাগবে না।

—খালি প্রেমের গল্প বুঝি?

—অতি জ্যাঠা ছেলে তুই। বড়দের জন্যে লেখা গল্প ছোটদের ভাল লাগে নাকি? এই তো সেদিন তোর মা শেষের কবিতা পড়ছিল, তুই শুনে বললি, বিচ্ছিরি। আলো নিবিয়ে দিই, ঘুমিয়ে পড়।

সরসী পিসী চলে গেলে ঝিন্টু শুয়ে পড়ল, কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না। এক ঘণ্টা এপাশ ওপাশ করে সে বিছানা থেকে তড়াক করে উঠে পড়ল। তার মাথায় খেয়াল এসেছে, একটা অ্যাডভেঞ্চার করতে হবে। ডিটেকটিভ, ডাকাত, বোম্বেটে, গুপ্ত ধন, এই সবের গল্প সে অনেক পড়েছে। আজ রাত্রে যদি সে গুপ্ত ধন আবিষ্কার করতে পারে তো কেমন মজা হয়! সে তার মায়ের কাছে শুনেছিল, তার এক বৃদ্ধপ্রপিতামহ অর্থাৎ প্রপিতামহের জেঠা পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন। অনেককাল হল তিনি মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর তোরঙ্গটি তেতলার ঘরে এখনও আছে। সেই তোরঙ্গ খুলে দেখলে কেমন হয়?

ঝিন্টুর একটা টর্চ আছে, দেড় টাকা দামের একটা পিস্তলও আছে। পিস্তলটা কোমরে ঝুলিয়ে টর্চ নিয়ে সে তেতলায় উঠল। সেখানে সিঁড়ির পাশে একটি মাত্র ঘর, তাতে শুধু দরকারি বাজে জিনিস থাকে। সেই ঘরে ঢুকে ঝিন্টু সুইচ টিপে আলো জ্বালল। তার বৃদ্ধপ্রপিতামহ করালীচরণ মুখুজ্জের তোরঙ্গটা এক কোণে রয়েছে। বেতের তৈরি, তার উপর মোষের চামড়া দিয়ে মোড়া, অদ্ভুত গড়ন, যেন একটা প্রকাণ্ড কচ্ছপ। যে তালা লাগানো আছে তাও অদ্ভুত। দেওয়ালে এক গোছা পুরনো চাবি ঝুলছে। ঝিন্টু একে একে সব চাবি দিয়ে তালা খোলবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে হতাশ হয়ে ফিরে যাবার উপক্রম করছে, হঠাৎ নজরে পড়ল, তোরঙ্গের পিছনের কব্জা দুটো মরচে পড়ে খয়ে গেছে। একটু টানাটানি করতেই খসে গেল। ঝিন্টু তখন তোরঙ্গের ডালা পিছন থেকে উলটে খুলে ফেলল।

বিশশ্রী ছাতা-ধরা গন্ধ। উপরে কতগুলো ময়লা গেরুয়া রঙের কাপড় রয়েছে, তার নীচে এক গোছা তালপাতায় লেখা পুঁথি আর তিনটে মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা। তার নীচে আবার কাপড়, তামার কোষাকুষি, সলদা রঙের সরার মতন একটা পাত্র, একটা মরচে ধরা ছোট ছুরি, একটা সরু কলকে, অত্যন্ত ময়লা এক টুকরো নেকড়া, আর একটা চিমটে। ঝিন্টু যদি চৌকস লোক হত তা হলে বুঝত — সাদা সরাটা হচ্ছে খর্পর অর্থাৎ মড়ার মাথার খুলি, আর ছুরি কলকে নেকড়া চিমটে হচ্ছে গাঁজা খাওয়ার সরঞ্জাম।

বিরক্ত হয়ে ঝিন্টু বলল, ধন্তোর, টাকা কড়ি হীরে মানিক কিচ্ছু নেই, তবে চিমটেটি মন্দ নয়, আন্দাজ এক ফুট লম্বা, মাথায় একটা আংটা, তাতে আবার আরও তিনটে আংটা গোছা করে লাগানো আছে। চিমটের গড়ন বেশ মজার, টিপলে মুখটা শেয়ালের মতন দেখায়, দু পাশে দুটো চোখ আর কানও আছে। বহুকালের জিনিস হলেও মরচে ধরে নি, বেশ চকচকে। তোরঙ্গ বন্ধ করে চিমটে নিয়ে ঝিন্টু তার ঘরে ফিরে এল।

আলো জ্বেলে বিছানায় বসে ঝিন্টু সুকুমার রায়ের বইগুলো কিছুক্ষণ উলটে পালটে দেখল। পাশের ঘরের ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। এইবার ঘুম পাচ্ছে। শোবার আগে সে আর একবার চিমটেটা ভাল করে দেখল। নাড়া পেয়ে মাথার আংটাগুলো ঝমঝম করে বেজে উঠল। তার পরেই এক আশ্চর্য কাণ্ড।

দরজা ঠেলে এক অদ্ভুত মূর্তি ঘরে ঢুকল। বেঁটে গড়ন, ফিকে রডব্যাক কালির মতন গায়ের রং, মাথার চুলে ঝুঁটি বাঁধা, মুখখানা বাঁদরের মতন, নন্দলালের আঁকা

নন্দীর ছবির সঙ্গে কতকটা মিল আছে। পরনে গেরুয়া রঙের নেংটি, পায়ে খড়ম। মূর্তি বলল, কি চাও হে খোকা?

ঝিন্টু প্রথমটা ভয়ে আঁতকে উঠল। কিন্তু সে সাহসী ছেলে, মূর্ত্তিমান অ্যাডভেঞ্চার তার সামনে উপস্থিত হয়েছে, এখন ভয় পেলে চলবে কেন। ঝিন্টু প্রশ্ন করল, তুমি কে?

—চণ্ডূদাস চণ্ড। তোমার পূর্বপুরুষ পিশাচসিদ্ধ হয়েছিলেন তা শুনেছ? আমি সেই পিশাচ।

—তোমাকেই সিদ্ধ করেছিলেন বুঝি?

—দূর বোকা, আমাকে সিদ্ধ করে কার সাধ্য! তিনি সাধনা করে নিজেই সিদ্ধ হয়েছিলেন, আমাকে বশ করেছিলেন। এই শিবমুখী চিমটেটি আমিই তাঁকে দিয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে এই বন্দোবস্ত হয়েছিল যে চিমটে বাজালেই আমি হাজির হব আমাকে যা করতে বলা হবে তাই করব। কিন্তু করালী মুখুজ্যে ছিলেন নির্লোভ সাধু পুরুষ, কখনও ধন দৌলতের জন্যে আমাকে ফরমাশ করেন নি। শুধু হুকুম করতেন—লে আও তম্বাকু, লে আও গঞ্জা, লে আও ওমদা কারণবারি বিলায়তী শরাব, লে আও অচ্ছী অচ্ছী ভৈরবী। তিনি মারা যাবার পর থেকে আমি নিষ্কর্মা হয়ে আছি। শোন খোকা—আজ হল বৈশাখী অমাবস্যা। এক শ বছর আগে এই অমাবস্যার রাত দুপুরে তোমার প্রপিতামহের জ্যেঠা করালী- চরণ মুখুজ্যে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। শর্ত অনুসারে আজ ঠিক সেই লগ্নে আমি কিঙ্করত্ব থেকে মুক্তি পাব, তার পর যতই চিমটে বাজাও আমি সাড়া দেব না। এখনও ঘণ্টা দুই সময় আছে। তোমার ডাক শুনে আমি এসেছি, কি চাই বল।

একটু ভেবে ঝিন্টু বলল, একটা হাঁসজারু দিতে পার?

—সে আবার কি?

ঝিন্টু বই খুলে ছবি দেখিয়ে বলল, এই রকম জন্তু, হাঁস আর শজারুর মাঝামাঝি।

—ও বুঝেছি। কিন্তু এ রকম জানোয়ার তো রেডিমেড পাওয়া যাবে না, সৃষ্টি করতে সময় লাগবে। ঘণ্টাখানিক পরে আমি একটা হাঁসজারু পাঠিয়ে দেব।

ঝিন্টু বলল, তা না হয় এক ঘণ্টা দেরিই হল, ততক্ষণ আমি ঘুমব। কিন্তু তুমি বেশী দেরি ক’রো না, মা বাবা সবাই এসে পড়বে। পিশাচ অন্তর্হিত হল।

ঝিন্টু ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ খটখট শব্দ শুনে তার ঘুম ভেঙে গেল। আলসে জ্বালাই ছিল, ঝিন্টু দেখল, একটা কিম্ভূত-কিমাকার জানোয়ার ঘরে ছুটোছুটি করছে। তার মাথা আর গলা হাঁসের মতন, ধড় শজারুর মতন, সমস্ত গায়ে কাঁটা খাড়া হয়ে আছে। চার পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে আর প্যাক প্যাক করে ডাকছে। ঝিন্টু উঠে বসল, আদর করে ডাকল—আ আ চু চু চু। হাঁসজারু পোষা কুকুরের মতন লাফিয়ে দুই থাবা তুলে কোলে উঠতে গেল। ঝিন্টুর হাঁটুতে কাঁটার খোঁচা লাগল, সে বিরক্ত হয়ে বলল, যাঃ, সরে যা, গায়ে যে একটু হাত বুলিয়ে দেব তারও জো নেই!

এই ঘরের ঠিক নীচের ঘরটি সরসী পিসীর। খাওয়ার পর সরসী একটা গোটা উপন্যাস সাবাড় করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাথার উপর দপ্‌দপ্‌ শব্দ হওয়ায় তার ঘুম ভেঙে গেল, বিরক্ত হয়ে বলল, আঃ, পাজী ছেলেটা এখনও ঘুময় নি, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সরসী উপরে উঠে ঝিন্টুর ঘরে ঢুকেই চমকে উঠে বলল, ও মা গো, এটা আবার কোত্থেকে এল!

ঝিন্টু বলল, ও আমি পুষেছি, কোনও ভয় নেই, কিচ্ছু বলবে না। কাল নাপিত ডেকে গায়ের কাঁটা ছাঁটিয়ে দেব, তা হলে আর হাতে ফুটবে না। একটু দুধ আর বিস্কুট এনে দাও না পিসীমা, বেচারার খিদে পেয়েছে।

আত্মরক্ষার জন্য সরসী ঝিন্টুর খাটের উপর উঠে বলল, এটাকে কোত্থেকে পেয়েছিস শিগ্‌গির বল ঝিন্টু।

হাত নেড়ে মুখভঙ্গী করে ঝিন্টু বলল, ইঃ বলব কেন!

—লক্ষ্মীতিটি বল কোথা থেকে এটা এল।

—আগে দিব্যি গাল যে কারুকে বলবে না।

—কালীঘাটের মা কালীর দিব্যি, কাকেও বলব না।

ঝিন্টু তখন সমস্ত ব্যাপারটি খুলে বলল। সরসীর বিশ্বাস হল না, বলল, তুই বানিয়ে বলছিস ঝিন্টু। করালী জেঠা পিশাচসিদ্ধ ছিলেন এই রকম শুনেছি বটে, কিন্তু ও একটা বাজে গল্প।

—বাজে গল্প! তবে এই দেখ—

ঝিন্টু চিমটে নেড়ে বন বন শব্দ করতেই চুণ্ডদাস চণ্ডের আবির্ভাব হল। সরসী ভয়ে কাঠ হয়ে চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল। পিশাচ বলল, কি চাই খোকা?

ঝিন্টু হুকুম করল, গরম মটর ভাজা, বেশ বড় বড়। বেশী করে দিও, পিসীমাও খাবে।

পিশাচ অন্তর্হিত হল। একটু পরেই একটা কাগজের ঠোঙা শূন্য থেকে ধপ করে ঘরের মেঝেতে পড়ল। সদ্য ভাজা বড় বড় মটরে ভরতি, এখনও গরম রয়েছে। এক মুঠো নিয়ে ঝিন্টু বলল, পিসীমা, একটু খেয়ে দেখ না।

সরসী গালে হাত দিয়ে বলল, অবাক কাণ্ড! বাপের জন্মে এমন দেখি নি, শুনিও নি। কিন্তু তুই কি বোকা রে খোকা। কোথায় দশ—বিশ লাখ টাকা, মস্ত বাড়ি, দামী মোটর গাড়ি, এই সব চাইবি, তা নয়, চাইলি কিনা হাঁসজারু আর মটর ভাজা! ছি ছি ছি। আচ্ছা, তোর ওই চিমটেটা একবারটি আমাকে দে তো।

পিসীর উপর ঝিন্টুর কোনও দিনই বিশেষ টান নেই। ভেঙচি কেটে বলল, ইস দিলুম আর কি! এই শেয়ালমুখো চিমটে আমি কারুকে দিচ্ছি না। তোমার কোন্ জিনিস দরকার বল না, আমি আনিয়ে দিচ্ছি।

—তুই ছেলেমানুষ, গুছিয়ে বলতে পারবি না।

—আচ্ছা, আমি চুণ্ডদাসকে ডাকছি। তুমি যা চাও আমাকে বলবে, আর আমি ঠিক সেই কথা তাকে বলব।

অগত্যা সরসী রাজী হল। ঝিন্টু চিমটে নাড়তেই আবার পিশাচ এসে বলল, কি চাই?

ঝিন্টু বললে, চটপট বলে ফেল পিসীমা, এক্ষুনি হয়তো বাবা মা এসে পড়বে।

ঝিন্টুর জবানিতে সরসী যা চাইলে তার তাৎপর্য এই।—আগে ওই জানোয়ার-