নীল তারা ইত্যাদি গল্প: জয়হরির জেন্তা
তাঁকে বিদেয় করতে হবে। তার পর দুর্লভ তালুকদার নামক এক ভদ্রলোককে ধরে আনতে হবে। তিনি কানপুর উলন মিলে চাকরি করেন। বাসার ঠিকানা জানা নেই। হাঁসজারু আর পিশাচ অন্তর্হিত হল। ঝিন্টু বলল, কানপুরের ভদ্রলোককে এনে কি হবে পিসীমা? —তাকে আমি বিয়ে করব। —বিয়ে করবে কি গো! তুমি তো বুড়ো ধাড়ী হয়েছ। —কে বলল, বুড়ো ধাড়ী! আমার বয়েস তো সবে পঁচিশ। —মা যে বলে তোমার বয়েস চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ? —মিথ্যে কথা, তোর মা হিংসুটে, তাই বলে। আর আমি তো আইবুড়ো মেয়ে, বয়েস যাই হক বিয়ে করব না কেন?
পিশাচ ফিরে আসার আগে একটু পূর্বকথা বলা দরকার। বারো-তের বছর পূর্বে সরসী যখন কলেজে পড়ত তখন দুর্লভ তালুকদারের সঙ্গে তার ভাব হয়। দুর্লভ বলেছিল, আমার একটি ভাল চাকরি পাবার সম্ভাবনা আছে, পেলেই তোমাকে বিয়ে করব। কিছুদিন পরে দুর্লভ চাকরি পেয়ে কানপুরে গেল। সেখান থেকে মাঝে মাঝে চিঠি লিখত—বড় মাগগি জায়গা, তোমার উপযুক্ত বাসাও পাই নি, মাইনে মোটে দু’শ টাকা, দুজনের চলবে কি করে? আশা আছে শীঘ্রই সাড়ে তিনশ টাকার গ্রেডে প্রমোশন পাব, ভাল কোয়ার্টার্সও পাব। লক্ষ্মীটি সরসী, তত দিন ধৈর্য ধরে থাক। তার পর ক্রমশ চিঠি আসা কমতে লাগল, অবশেষে একেবারে বন্ধ হল। সরসী বুঝল যে দুর্লভ মিথ্যাবাদী, কিন্তু তবু তাকে সে ভুলতে পারে নি।
পিশাচ একটি মোটা লোককে পাঁজকোলা করে নিয়ে এসে ধপ করে মেঝেতে ফেলে বলল, এই নাও থোকা, তোমার পিসীর বর। এখন বেহুঁশ হয়ে আছে, একটু পরেই চাঙ্গা হবে। দুর্লভের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ঝিন্টু বলল, উঃ, মামাবাবু ক্লাব থেকে ফিরে এলে যে রকম গন্ধ বেরয় সেই রকম লাগছে। ও চণ্ডু মশাই, একে জাগিয়ে দাও না। পিশাচ বলল, নেশায় চুর হয়ে আছে। কানপুরের একটা বস্তিতে ওর ইয়ারদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল, সেখান থেকে তুলে এনেছি। এই, উঠে পড় শিগগির। ঠেলা খেয়ে দুর্লভের চেতনা ফিরে এল। চোখ মেলে বলল, তোমরা আবার কে? ঝিন্টু বলল, পিসীমা, যা বলবার তুমি একে বল। —আমি পারব না, তুই বল থোকা। —ও মশাই, শুনছেন? এ হচ্ছে আমার সরসী পিসীমা, আইবুড়ো মেয়ে। একে আপনি বিয়ে করুন। দুর্লভ বলল, আহা কি কথাই শোনালে! বিয়ে কর বললেই বিয়ে করব? পিশাচ বলল, করবি না কি রকম? তোর বাবা করবে! একটি পৈশাচিক চড় খেয়ে দুর্লভ বলল, মেরো না বাবা, ঘাট হয়েছে। বেশ, বিয়ে করছি, পুরুত ডাক। কিন্তু বলে রাখছি, অলরেডি আমার একটি বাঙালী স্ত্রী আর খোট্টা জরু আছে। সরসী যদি তিন নম্বর সহধর্মিণী হতে চায় আমার আর আপত্তি কি। সবাই মিলে এক বিছানায় শুতে হবে কিন্তু। সরসী বলল, দূর করে দাও হতভাগা মাতালটাকে।
ঝিণ্টুর আদেশে পিশাচ দুর্লভকে তুলে নিয়ে চলে গেল। ঝিণ্টু বলল, আচ্ছা পিসীমা, তোমার আপিসে তো অনেক ভাল ভাল বাবু আছে, তাদের একজনকে আনাও না। একটু ভেবে সরসী বলল, আমাদের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট যোগীন বাঁড়ুজ্যের স্ত্রী দু বছর হল মারা গেছে। যোগীনবাবু লোকটি ভাল, তবে কালচার্ড নয়, একটু বয়সও হয়েছে। বড্ড তামাক খায়, কথা বললে হুঁকোহুঁকো গন্ধ ছাড়ে। তা কি আর করা যাবে, অত খুঁত ধরলে চলে না, সব পুরুষই মোর অর লেস ডার্টি। কিন্তু যোগীনবাবু রাজী হবে কি? মোটা বরপণ পেলে হয়তো— ঝিণ্টু বলল, বরপণ কি? গয়না আর টাকা? সে তুমি ভেবো না পিসীমা, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। চিমটে বাজিয়ে পিশাচকে ডেকে ঝিণ্টু বলল, পিসীমার আপিসে সেই যে যোগীন বাঁড়ুজ্যে কাজ করে—ঠিকানাটা কি পিসীমা? তিন নম্বর বেচু মিস্ত্রী লেন—সেইখান থেকে তাকে ধরে নিয়ে এস। আর শোন, পিসীমাকে একগাদা গয়না আর অনেক টাকা দাও। সরসীর সর্বাঙ্গ মোটা মোটা সোনার গহনায় ভরে গেল, পাঁচটা থলিও ঝনাত করে তার পায়ের কাছে পড়ল। পিশাচ চলে গেল। একটা থলি তুলে সরসী বলল, সের পাঁচ-ছয় ওজন হবে। ঝিণ্টু বলল, পাঁচ শ টাকায় সওয়া ছ-সের, হাজার টাকায় সাড়ে বারো সের, লাখ টাকায় একত্রিশ মন দশ সের। ‘জ্ঞানের সিন্দুক’ বইএ আছে। পিশাচ যোগীন বাঁড়ুজ্যেকে পাঁজাকোলা করে এনে মেঝেতে ফেলল। ঝিণ্টু বলল, এও নেশা করেছে নাকি? পিশাচ বলল, নেশা নয়, অজ্ঞান করে নিয়ে এসেছি, একটু ঠেলা দিলেই চাঙ্গা হবে। থাম, আগে আমি সরে পড়ি, নয়তো আমাকে দেখে আবার ভিরমি যাবে। ঠেলা খেয়ে যোগীন বাঁড়ুজ্যে উঠে বসলেন। হাই তুলে তুড়ি দিয়ে বললেন, দুর্গা দুর্গা, এ আমি কোথায়? একি, মিস সরসী মুখার্জী এখানে যে! উঃ, কত গহনা পরেছেন! আপনার বিবাহের নিমন্ত্রণে এসেছি নাকি? মুখ নীচু করে সরসী বলল, খোকা, তুই বল। ঝিণ্টু বলল, স্যার, আপনি আমার এই সরসী পিসীমাকে বিয়ে করুন, ইনি আইবুড়ো মেয়ে, বয়স সবে পঁচিশ। দেখছেন তো, কত গয়না, আবার পাঁচ থলি টাকাও আছে, এক-একটা পাঁচ-ছ সের। যোগীনবাবু বললেন, বাঃ খোকা, তুমি নিজেই সালংকারা পিসীকে সম্প্রদান করছ নাকি? তা আমার অমত নেই, মিস মুখার্জির ওপর আমার একটু টাঁকও ছিল। তবে কিনা ইনি হলেন মডার্ন মহিলা, তাই এগুতে ভরসা পাই নি। গহনা- গুলো বড্ড সেকেলে, কিন্তু বেশ ভারী মনে হচ্ছে, বেচে দিয়ে নতুন ডিজাইনের গড়ালেই চলবে। কিন্তু ব্যাপারটা যে কিছুই বুঝতে পারছি না, এখানে আমি এলুম কি করে? সরসী বলল, সে কথা পরে শুনবেন! এখন বাড়ি যান, কাল সকালে এসে আমার দাদাকে বিবাহের প্রস্তাব জানাবেন! এই আংটিটা পরুন তা হলে ভুলে যাবেন না। —ভুলে যাবার জো কি! কাল সকালেই তোমার দাদাকে বলব। এখন কটা
বেজেছে? বল কি, পৌনে বারো! তাই তো, বাড়ি যাব কি করে, ট্রাম বাস সব তো বন্ধ।
ঝিন্টু বলল, কিচ্ছু ভাববেন না সার, একবারটি শুয়ে পড়ে চোখ বুজুন তো। যোগীন বাঁড়ুজ্যে সুবোধ শিশুর ন্যায় শুয়ে পড়ে চোখ বুজলেন। শিবামুখী চিমটের আওয়াজ শুনে পিশাচ আবার এল। ঝিন্টু তাকে ইশারায় আজ্ঞা দিল— একে নিজের বাড়িতে পৌঁছে দাও!
বারোটা বাজল। সরসী বলল, দাদা বৌদি এখনই এসে পড়বে। যাই, গয়নাগুলো খুলে ফেলি গে, টাকার থলিগুলোও তুলে রাখতে হবে। তোর মোটে বুদ্ধি নেই, টাকা না চেয়ে নোট চাইলি না কেন? ঝিন্টু বাবা আমার, কোনও কথা কাকেও বলিস নি।
—না না, বলব কেন। এই যা, চুনটু দাসের কাছে একটা বেজি চেয়ে নিতে ভুলে গেছি। ইস্কুলের দরোয়ান রামভজনের কেমন চমৎকার একটি আছে, খুব পোষা, কাঁধের ওপর লেপটে থাকে।
—ভাবিস নি খোকা, যত বেজি চাস তোর পিসে মশাই তোকে কিনে দেবে। তুই আর জবর গায়ে জাগিস নি, শুয়ে পড়।
—কোথায় জবর! সে তো চুনটু দাসকে দেখেই সেরে গেছে। —হ্যাঁরে খোকা, আমরা স্বপন দেখছি না তো? সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি গহনা আর টাকা সব উড়ে গেছে? —গেলই বা উড়ে। যোগীনবাবু আবার গড়িয়ে দেবে, টাকাও দেবে। —যোগীনবাবুও যদি উড়ে যায়? —যাক গে উড়ে। তুমি এই মটরভাজা একটু খেয়ে দেখ না, কেমন কুড়কুড়ে। বেশ করে চিবিয়ে গিলে ফেল, তা হলে কিছুতেই উড়ে যেতে পারবে না।
১৩৬২ (১৯৫৫)