নীল তারা ইত্যাদি গল্প: তিলোত্তমা
তিলোত্তমা
সিদ্ধিনাথের নাম আপনারা শুনে থাকবেন।* বিদ্যার খ্যাতি আছে, সরকারী কলেজে পড়াতেন, কিন্তু মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ায় চাকরি ছেড়ে প্রায় তিন বৎসর নিষ্কর্মা হয়ে বাড়িতে বসে ছিলেন। এখন ভাল আছেন, শিবচন্দ্র কলেজে পড়াচ্ছেন। সম্প্রতি কুবুদ্ধির সম্বন্ধে থিসিস লিখে পিএইচ. ডি. ডিগ্রী পেয়েছেন। সিদ্ধিনাথের বাল্যবন্ধু উকিল গোপাল মুখুজ্জের বাড়িতে যথারীতি সান্ধ্য আড্ডা বসেছে। উপস্থিত আছেন—গোপালবাবু, তাঁর পত্নী নমিতা, নমিতার ছোট বোন (সিদ্ধিনাথের ভূতপূর্ব ছাত্রী) অসিতা, অসিতার স্বামী রমেশ ডাক্তার, আর সিদ্ধিনাথ। সিদ্ধিনাথের বাড়ি খুব কাছে। তাঁর স্ত্রী নবদুর্গা একটু সেকেলে, এই মেয়ে-পুরুষের আড্ডায় তিনি আসেন না। আড্ডারম্ভে গোপালবাবু বললেন, ওহে সিদ্ধিনাথ, তুমি ডক্টরেট পেয়েছ তাতে আমরা সবাই খুশি হয়েছি। সম্মান তোমার বিদ্যের তুলনায় অবশ্য কিছুই নয়, তবে শোনায় ভাল—ডক্টর সিদ্ধিনাথ ভট্টাচার্য। নমিতা তোমাকে আর অশ্রদ্ধা করতে পারবে না। নমিতা বললেন, ডক্টর একটা নিতান্ত বাজে উপাধি, গণ্ডা গণ্ডা ডক্টর পথেঘাটে গড়াগড়ি যাচ্ছে। আমি ওঁকে একটি ভাল উপাধি দিচ্ছি—বক্বক্তা। অসিতা বলল, মানে কি দিদি? —মানে খুব সোজা। যে বকে সে বক্তা, আর যে বকবক করে সে বক্বক্তা। সিদ্ধিনাথ বললেন, থ্যাংক ইউ নমিতা দেবী, আপনার প্রদত্ত উপাধিটির মর্যাদা রাখতে আমি সর্বদাই চেষ্টা করব। নমিতা বললেন, তবে আর সময় নষ্ট করেন কেন, আপনার বক্বক্তৃতা এখনই শুরু করুন না। —কোন্ বিষয় শুনতে চান? শঙ্করের অদ্বৈতবাদ, মার্কসের দ্বান্দ্বিক জড়বাদ, শরীরতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব না পরলোকতত্ত্ব? গোপালবাবু বললেন, ওসব নীরস তত্ত্ব শুনতে চাই না। প্রেমের কথা যদি তোমার কিছু জানা থাকে তো তাই বল। —হাড়ে হাড়ে জানা আছে। আমি নিজেই একবার বিশ্রী রকম প্রেমে পড়েছিলুম। নমিতা বললেন, আস্পর্ধা কম নয়! বাড়িতে পাহারাওয়ালী গিন্নী থাকতে প্রেমে পড়লেন কোন্ আক্কেলে? বলতে লজ্জা হয় না? —মানুষের যা স্বাভাবিক ধর্ম তা স্বীকার করতে লজ্জা হবে কেন। আপনার মুখেই তো শুনেছি যে অসিতার বউভাতের ভোজে আপনি গবগব করে চার গণ্ডা ভেটকি মাছের ফ্রাই খেয়েছিলেন। তার জন্যে তো আপনাকে রাক্ষসী কি মেছো-পেত্নী বলছি না।
- সিদ্ধিনাথের পূর্বকথা “গল্পকল্প” পুস্তকে আছে।
গোপালবাবু বললেন, আঃ ঝগড়া কর কেন। নমিতা, সিদ্ধুকে বলতে দাও, তোমার মন্তব্য শেষে ক’রো।
সিদ্ধিনাথ বলতে লাগলেন—ব্যাপারটা ঘটেছিল আমার বিবাহের আগে, গিন্নী থাকতে প্রেম হবার জো কি! তখন বয়স বাইশ-তেইশ, পোস্টগ্র্যাজুয়েটে পড়ি, বাবা মা দুজনেই বর্তমান। ওহে রমেশ ডাক্তার, তোমাদের শাস্ত্রে এই কথা বলে তো—কোনও দেশে একটা নতুন ব্যাধি যদি আসে তবে প্রথম প্রথম তা মারাত্মক হয়, কিন্তু দু-এক শ বছর পরে তার প্রকোপ অনেক কমে যায়? রমেশ বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ, কোনও কোনও রোগের বেলা তাই হয় বটে। —প্রেমও সেই রকম ব্যাধি। এর তিন দশা আছে। প্রাইমারি স্টেজে প্রেম হল নাইনটি পারসেন্ট লালসা, টেন পারসেন্ট ভালবাসা। সেকেন্ডারি স্টেজে হাফ অ্যান্ড হাফ। টারশিয়ারিতে প্রায় সবটাই ভালবাসা, নামমাত্র লালসা। পুরাকালে পূর্বরাগ অর্থাৎ প্রেমের প্রথম আক্রমণ অতি সাংঘাতিক হত। কাদম্বরীতে বানভট্ট লিখেছেন—মহাশ্বেতার প্রেমে পড়ে পুণ্ডরীক হার্ট ফেল করে মারা যায়। আরব্য উপন্যাসের অনেক নায়ক-নায়িকা প্রেমে শয্যাশায়ী হত। অমন যে জবরদস্ত রাজর্ষি আরংজেব বাদশা, তিনিও প্রথম যৌবনে গোলকুণ্ডার এক নবাবনন্দিনীকে দেখে মরণাপন্ন হয়েছিলেন। আজকাল এরকম বড় একটা দেখা যায় না, কারণ মেয়ে পুরুষ সবাই খুব হিসেবী হয়েছে, তা ছাড়া দেদার প্রেমের গল্প প’ড়ে আর সিনেমার ছবি দেখে খানিকটা ইমিউনিটিও এসেছে। কিন্তু দৈবক্রমে আমি যে প্রেমের কবলে পড়েছিলুম তা সেই সেকালের ভিরুলেন্ট টাইপের। তবে বেশি ভুগতে হয়নি, পাঁচ দিনের মধ্যেই সেরে উঠি। নমিতা বললেন, কিসে সরল, পেনিসিলিন না ক্ষ্যাপা কুকুরের ইনজেকশনে? —ওষুধের কাজ নয়! গুরুর কৃপায় সেরেছিল। —আপনি তো পাষণ্ড লোক, আপনার আবার গুরু কে? —যিনি জ্ঞানদাতা বা শিক্ষাদাতা তিনিই গুরু। সম্প্রতি আমার দুটি গুরু জুটেছে—আমার ছাত্র পরাশর হোড়, আর এ পাড়ার বখাটে ছোকরা গুলচাঁদ। পরাশরের কাছে কবিতা রচনা শিখছি, আর গুলচাঁদের কাছে বাইসিক্ল চড়া। অসিতা বলল, স্যার, আপনি তো বলতেন যে কাব্যচর্চা আর গাঁজা খাওয়া দুই সমান, তবে শিখছেন কেন? কিছু লিখছেন নাকি? —রাম বল। লেখবার জন্যে শিখছি না, শুধু কবিতা লেখার প্যাঁচটা জানতে চাই। আর বাইসিক্ল শিখছি ট্রাম-বাসের ভাড়া বাঁচাবার জন্যে। দেখ অসিতা, কবিতা লেখা অতি সোজা কাজ, মাস খানিক প্র্যাকটিস করলে তুমিও পারবে, হয়তো তোমার দিদিও বছর খানিক চেষ্টা করলে পারবেন। কেন যে লোকে কবির খাতির করে— নমিতা বললেন, বাজে কথা রাখুন। কার সঙ্গে প্রেম হয়েছিল? অত চট করে সরলই বা কি করে? প্রতিদ্বন্দ্বী আপনাকে ঠ্যাঙিয়েছিল নাকি? —ধৈর্য ধরুন, যথাক্রমে সবই শুনবেন। প্রেমে পড়ার চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই কাবু হয়েছিলুম। আহারে রুচি নেই, মাথা টিপটিপ করে, বুক ঢিপঢিপ করে, ঘুম মোটেই হয় না, লেখাপড়া চুলায় গেল, চব্বিশ ঘণ্টা শয্যাশায়ী। মা বললেন, হ্যাঁরে সিদ্ধু, তোর হয়েছে কি? কপালটা যেন ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে। বাবা ডাক্তার ডাকলেন। নাড়ী জিব
তিলোত্তমা
বুক পেট সব দেখে ডাক্তার বললেন, ডেঙ্গু মনে হচ্ছে, ভয়ের কারণ নেই, নড়াচড়া বন্ধ রাখবে, লিকুইড ডায়েট চলবে। এক আউন্স ক্যাস্টর অয়েল এখনই খাইয়ে দিন, আর দশ গ্রেন কুইনীন নেবুর রস দিয়ে জলে গুলে এবেলা একবার ওবেলা একবার। মুখটা তেতো রাখা দরকার। রামদাস কাব্যসাংখ্যবেদান্তচঞ্চু তখন ইউনিভার্সিটিতে প্রাচ্যদর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। এখন তিনি নাগপুরে আছেন। বয়স বেশি নয়, আমার চাইতে ছ-সাত বছরের বড়। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা একটু রসিক হয়ে থাকেন। রামদাসও রসিক লোক, ছাত্রদের সঙ্গে ইয়ার্কি দিতেন, কিন্তু সকলেই তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করত। আমাকে তিনি বিশেষ রকম স্নেহ করতেন, কারণ বিদ্যায় আর রূপে আমিই ক্লাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলুম। নমিতা বললেন, জন্ম ইস্তক বিদ্যের জাহাজ ছিলেন তা না হয় মানলুম, কিন্তু রূপ আবার কোথায় পেলেন? এই তো গলিখোরের মতন চেহারা, গরুর মতন ড্যাবডেবে চোখ, শুয়োরকুঁচির মতন চুল— —সকলেই আপনার মতন অন্ধ নয়, সমঝদার রূপদর্শী লোক ঢের আছে। দু দিন আমাকে ক্লাসে দেখতে না পেয়ে চঞ্চু মহাশয় জিজ্ঞাসা করলেন, সিদ্ধিনাথ কামাই করছে কেন? ছাত্ররা বলল, তার ভারী অসুখ। আমার বাবার সঙ্গে তাঁর বাবার বন্ধুত্ব ছিল, সেই সূত্রে চঞ্চু মহাশয় মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসতেন। অসুখ শুনে আমাকে দেখতে এলেন। নমিতা বললেন, বকবক করে শুধু বাজে কথা বলছেন। প্রেমে পড়লেন অথচ প্রেমপাত্রীটির কোনও খবর নেই। তার নাম কি, পরিচয় কি, দেখতে কেমন, সব বৃত্তান্ত খুলে বলুন, আপনার রামদাস চঞ্চুর কথা শুনতে চাই না। —ব্যস্ত হবেন না, কি জাতি কি নাম ধরে কোথায় বসতি করে সবই শুনতে পাবেন। মেয়েটি দেখতে কেমন তা জানবার জন্যে ছটফট করছেন, নয়? আচ্ছা এখনই বলে দিচ্ছি—অতি সুন্দরী গৌরী তন্বী, আপনার মতন গোবদা নয়, হিংসুটেও নয়। গোপাল কি দেখে যে আপনার প্রেমে মজেছে তা বুঝতেই পারি না। —বোঝাবার কোনও দরকার নেই, পরচর্চা না করে নিজের কথা বলুন। —শুনুন। চঞ্চু মহাশয় যখন দেখতে এলেন তখন আমার ঘরে আর কেউ ছিল না। আমি চিতপাত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি, কপালে ওডিকলোনের পট্টি, চোখে উদাস করুণ দৃষ্টি, মুখ দিয়ে মাঝে মাঝে আঃ ইঃ উঃ এঃ ওঃ প্রভৃতি কাতর ধ্বনি বেরুচ্ছে।
রামদাস প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে সিদ্ধিনাথ? বললুম, কি জানি স্যার। শরীর অত্যন্ত খারাপ, বড় যন্ত্রণা, আমি আর বাঁচব না। চঞ্চু মহাশয় আমার নাড়ী দেখলেন, চোখ দেখলেন, বুক আর পিঠে হাত বুলালেন। তার পর ঠোঁট কুঁচকে মাথা নেড়ে বললেন, হুঁ, সব লক্ষণ মিলে যাচ্ছে। —কিসের লক্ষণ পণ্ডিত মহাশয়? —সাত্ত্বিক বিকারের অষ্ট লক্ষণ প্রকট হয়েছে—স্তম্ভ স্বেদ রোমাঞ্চ স্বরভঙ্গ বেপথু বৈবর্ণ অশ্রু মূর্ছা। সাত্ত্বিক বিকার মানে কি স্যার? —মানে, তুমি ঘোরতর প্রেমে পড়েছ, সর্বতোভাবে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছ। ঠিক বলেছি কি না?
আমি ঢাকবার চেষ্টা করলুম না, বললুম, আজ্ঞে ঠিক। —পাত্রীটি কে? নাম-ধাম বলে ফেল, যদি অলঙ্ঘনীয় বাধা না থাকে তবে সম্বন্ধের চেষ্টা করব। —কোনও আশা নেই স্যার, বৈবাহিক অবৈবাহিক কোনও সম্পর্কই হবার জো নেই। আমার নাগালের একদম বাইরে। চঞ্চু মহাশয় বললেন, যদি নাগালের বাইরেই হয় এবং কোনও আশাও না থাকে তবে বৃথা তার চিন্তা করছ কেন? মন থেকে একেবারে মুছে ফেল। —চেষ্টা তো করছি, কিন্তু পারছি না যে। —আচ্ছা, তার ব্যবস্থা আমি করছি। আগে তার পরিচয় দাও। আমি সবিস্তারে পরিচয় দিলুম। তাকে সিনেমায় দেখেছি, তিলোত্তমা-ছবিতে নায়িকার পার্টে— নমিতা বললেন, আরে রাম রাম, ছি ছি, এত ভনিতার পর সিনেমার অ্যাক্ট্রেস! ইস্কুলের চ্যাংড়া ছেলেরাই তো সে রকম প্রেমে পড়ে। ডক্টর সিদ্ধিনাথ বকবক্তার নজর অত ছোট তা মনে করি নি, উঁচুদরের কিছু আশা করেছিলুম। অন্তত একটি পিস্তলওয়ালী অগ্নিদিদি, কিংবা নাটোরের বনলতা সেন। অসিতা বলল, অমন আশা তোমার করাই অন্যায় দিদি, এঁর তো তখন কম বয়স, ডক্টর বা বকবক্তা কোনও খেতাবই পান নি। সিদ্ধিনাথ বললেন, ছি ছি করবার কোন কারণ নেই, আমার মনোরথে আকাশের নক্ষত্র জোতা ছিল। তিলোত্তমা ছবিতে সে নায়িকা সাজত, তার নিজের নামও তিলোত্তমা। তার বাপ আর ঠাকুরদা বাঙালী, ঠাকুমা বর্মী, মা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, দিদিমা ইংরেজ, দাদামশায় পঞ্জাবী। অ্যাভারেজ বাঙালী মেয়ে মোটেই সুন্দরী নয়। জারুল কাঠের মতন গায়ের রং, ছোট ছোট চোখ, এ কান থেকে ও কান পর্যন্ত মুখের হাঁ—যেন ইঁদুর ধরা জাঁতিকল, মোটা ঠোঁট, থুতনি অতটুকু। বিশ্বাস না হয় তো আরশিতে মুখ দেখবেন।
নমিতা বললেন, বাঙালী পুরুষদের চেহারা কেমন তা শুনবেন? চোয়াড়ে গড়ন, আবনূস কাঠের মতন রং— সিদ্ধিনাথ হাত নেড়ে বললেন, থামুন, থামুন, যা বলবার গোপালকে আড়ালে বলবেন, অন্যের কাছে পতিনিন্দা মহাপাপ। যা বলছিলুম শুনুন। তিলোত্তমার দেহে চার জাতের রক্ত মিশেছিল, সেজন্যই সে অসাধারণ সুন্দরী। গোড়ালি পর্যন্ত চুল, চাঁপা ফুলের মতন রং— অসিতা বলল, রং কি করে টের পেলেন স্যার? তখন তো টেকনিকলার হয় নি। —রংটা অনুমান করেছিলুম। লম্বা ছিপছিপে গড়ন, পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী, চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা, পীনস্তনী, নিবিড়নিতম্বা। কালিদাস যাকে বলেছেন—যুবতী বিষয়ে বিধাতার আদ্যা সৃষ্টি। নমিতা বললেন, বিধাতার সৃষ্টি থোড়াই, আপনি আদেখলে হাঁদা ছিলেন তাই আসল রূপ টের পান নি। রং সস্তা, পরচুল তুলো আর খড় দিয়ে কি গড়া যায় তার কোনও আইডিয়াই আপনার নেই। —হুঁ, রামদাস চঞ্চুও তাই বলেছিলেন বটে। তারপর শুনুন। তিলোত্তমার গলার আওয়াজ এত মিষ্টি যে তা বলবার নয়। —উপমা খুঁজে পাচ্ছেন না? রূপালী কণ্ঠস্বর বলা চলবে?
তিলোত্তমা
—ও হল ইংরাজীর অন্ধ নকল, কণ্ঠস্বর সোনালী রূপালী হয় না। সোনা রূপোর আওয়াজও ভাল নয়। বরং স্টীলের তারের সঙ্গে তুলনা দেওয়া যেতে পারে, যেমন বীণার ঝংকার কিংবা দামী ঘড়ির গংয়ের ডিং ডং। তার পর শুনুন। রামদাস চঞ্চু তিলোত্তমার বিবরণ শুনে প্রশ্ন করলেন, তার সঙ্গে তোমার আলাপ হয়েছে? বললুম, আলাপ কোত্থেকে হবে স্যার, সে থাকে বোম্বাইতে। তাকে কোনও দিন সশরীরে দেখি নি, শুধু ছবিতেই তার মূর্তি দেখেছি, ছবিতেই তার কথা আর গান শুনেছি। চঞ্চু মহাশয় সহাস্যে বললেন, বেশ বেশ! কায়া দেখ নি, শুধু ছায়া দেখেছ! এখন শুয়ে শুয়ে ছায়াও দেখছ না, শুধু মায়া দেখছ। ভয় নেই, আমি তোমাকে উদ্ধার করব। সাংখ্য দর্শনে বলে—প্রকৃতি এক, আর পুরুষ অনেক। পুরুষ আসলে শুদ্ধ বুদ্ধ নির্বিকার, কিন্তু তার সামনে যখন প্রকৃতি সেজেগুজে নৃত্য করে তখন পুরুষের বিকার হয়, সে ভবযন্ত্রণা ভোগ করে। প্রজ্ঞা লাভ করলেই পুরুষের নেশা ছুটে যায়, প্রকৃতি অন্তর্হিত হয়। তুমি একজন পুরুষ, তিলোত্তমারূপা প্রকৃতি তোমার সামনে নেচেছিল, এখনও তোমার মনের মধ্যে নাচছে, তাই তোমার এই দশা। বৎস সিদ্ধিনাথ, প্রবুদ্ধ হও, তোমার পৌরুষ দেখাও, প্রকৃতিকে ধমক দিয়ে বল, দূর হ মায়াবিনী, ভাগো, গেট আউট। ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মোহমুক্ত হয়ে কৈবল্য লাভ কর।
আমি বললুম, ওসব তত্ত্বকথায় কিছুই হবে না স্যার। —বেশ, সাংখ্য যদি কাজ না হয় তবে অদ্বৈতবাদ শোন। এই জগতে হরেক রকম যা দেখছ তার কোনও অস্তিত্ব নেই, শুধুই মায়া। একমাত্র ব্রহ্মই আছেন, তিনি পুরুষ নন, স্ত্রী নন, ক্লীবলিঙ্গ। এবং তুমিই সেই ব্রহ্ম। —বলেন কি স্যার! আপনি ব্রহ্ম নন? —আমিও ব্রহ্ম। তিলোত্তমা, তোমার সহপাঠীরা, তোমাদের ভাইসচ্যান্সেলার, প্রত্যেকেই ব্রহ্ম। সবাই এক, শুধু মায়ার জন্য আলাদা আলাদা বোধ হয়। —আপনি বলতে চান তিলোত্তমা আর আমাদের বাড়ির কুঞ্জী বুড়ী ঝি দুইই এক। —তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সুন্দর বা কুৎসিত, সাধু বা অসাধু, সব তুল্যমূল্য, এক পরমাত্মা সর্বভূতে বিরাজমান। বোকা লোক মনে করে এক সের তুলোর চাইতে এক সের লোহা বেশী ভারী, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুইেরই ওজন সমান। —মানি না স্যার। আপনি নীচের ওই উঠনে দাঁড়ান, আমি দোতলা থেকে আপনার মাথায় এক সের তুলো ফেলব, তার পর এক সের লোহা ফেলব। তার পরেও যদি বেঁচে থাকেন তবে আপনার কথা মানব। অট্টহাস্য করে চঞ্চু মহাশয় বললেন, ওহে সিদ্ধিনাথ, গরুমারা বিদ্যে এখনও তোমার হয় নি, একটু সায়েন্স পড়ো। তুমি গুরুত্ব আর আপেক্ষিক গুরুত্ব, ভার আর সংঘাত গুলিয়ে ফেলেছ। আমি বললুম, যাই বলুন, স্যার, আপনার অদ্বৈতবাদে কোনও ফল হবে না। তিলোত্তমা হচ্ছে আলোকসামান্যা নারী, তার সঙ্গে কারও তুলনাই হতে পারে না। তার চেহারা অভিনয় আর গান আমাকে জাদু করেছে। চঞ্চু মহাশয় বললেন, তবে কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ কর, যাকে বলে কমন সেন্স! পক্ষীরাজ ঘোড়া, আকাশকুসুম, শিঙওয়ালা খরগোশ এ সবে বিশ্বাস কর?
—আজ্ঞে না, ওসব তো কল্পনা, কিন্তু তিলোত্তমা বাস্তব। —একবারেই ভুল। কবি খুব হাতে রেখেই বলেছেন, অর্ধেক কল্পনা তুমি অর্ধেক মানবী। তোমার তিলোত্তমা অর্ধেক নয়, পনেরো আনা কল্পনা। তুমি তার কতটুকু জান হে ছোকরা? তার মূর্তিটা জোড়াতালি দিয়ে তৈরী; তার ভাষা নিজের নয়, নাট্যকারের; তার গানও নিজের নয়, অন্য মেয়ে আড়াল থেকে গেয়েছে। একটা কৃত্রিম মানবীর চিত্রার্পিতা ছায়া দেখে তুমি ভুলেছ। তার মেজাজ তুমি জান না, হয়তো খেঁকী কুণ্ডলা, হয়তো নেশা করে, হয়তো দেমাকে মটমট করছে, হয়তো তার কালচারেরও বিশেষ কিছু নেই। একটু ভেবে আমি বললুম, পণ্ডিত মহাশয়, আপনার কথা শুনে এখন মনে পড়ছে—তিলোত্তমা সরোবরকে সড়োবড়, জিহ্বাকে জেহোভা, আর প্রেমকে ফ্রেম বলেছিল। —তবেই বোঝ। তুমি আবার ভীষণ খুঁতখুঁতে। যদি তোমাদের মিলন হয়, তার সঙ্গে তুমি যদি ঘর কর, তবে দু দিনেই তার গ্ল্যামার লোপ পাবে। সেকালে কলকাতায় একজন অতি শৌখিন বনেদী বড়লোক ছিলেন। তিনি রোজ সন্ধ্যায় তাঁর রূপসী রক্ষিতার বাড়িতে যেতেন, দুপুর রাতে বাড়ি ফিরতেন। কোনও কারণে দু দিন তিনি যেতে পারেন নি। বিরহ যন্ত্রণা সইতে না পেরে তৃতীয় দিনে ভোর বেলায় তিনি হাজির হলেন। দেখলেন, তাঁর প্রেয়সী গামছা পরে গাড়ু হাতে কোথায় চলছেন। তাই দেখে ভদ্রলোক আকাশ থেকে পড়ে বললেন, এঃ, তুমি—তুমি— নমিতা বললেন, আপনি অতি অসভ্য, মুখে কিছুই বাধে না। —ও তো আমি বলি নি, গুরুমুখে যা শুনেছি তাই আবৃত্তি করেছি। প্রেয়সীর সেই অদৃষ্টপূর্ব প্রাকৃত রূপ দেখে ভদ্রলোকের মোহ কেটে গেল, তিনি বৈরাগ্য অবলম্বন করে বৃন্দাবনবাসী হলেন। নমিতা বললেন, আপনার নিজের কি হল তাই বলুন।
—তারপর চঞ্চু মহাশয় বললেন, ওহে সিদ্ধিনাথ, এখন তোমাকে আসল তিলোত্তমার ইতিহাস বলছি শোন। সুন্দ উপসুন্দ দুই ভাই ছিল হরিহরাত্মা। তাদের উপদ্রবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নিলেন। ব্রহ্মা বললেন, ভয় নেই, আমি দু দিনেই ওদের সাবাড় করে দিচ্ছি। তিনি ব্রাহ্মী মায়ায় এক সিন্থেটিক ললনা সৃষ্টি করলেন। জগতের যাবতীয় সুন্দর বস্তুর তিল তিল উপাদানের সংযোগে তৈরী সেজন্য তার নাম হল তিলোত্তমা। তার ট্রায়াল দেখবার জন্য দেবতারা ব্রহ্মসভায় সমবেত হলেন। ব্রহ্মার চার দিকে ঘুরে ঘুরে তিলোত্তমা নাচতে লাগল। পিতামহ প্রবীণ লোক, চক্ষুলজ্জা আছে, ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে পারেন না, অথচ দেখবার লোভ ষোল আনা। অগত্যা তাঁর ঘাড়ের চার দিকে চারটে মুণ্ডু বার হল। ইন্দ্রের সর্বাঙ্গে সহস্র লোচন ফুটে উঠল, তাই দিয়ে তিনি চোঁ চোঁ করে তিলোত্তমার রূপসুধা পান করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ নাচ দেখে ব্রহ্মা বললেন, বাঃ, খাসা হয়েছে, এখন তুমি সুন্দ উপসুন্দের কাছে গিয়ে তাদের সামনে নৃত্য কর। তিলোত্তমা তাই করল। তাকে দখল করবার জন্য দুই ভাই কাড়াকাড়ি মারামারি করে দুজনেই মরল। দেবতারা নিরাপদ হলেন। ইন্দ্র বললেন, তিলোত্তমা, আমার সঙ্গে অমরাবতীতে চল, শচীকে বরখাস্ত করে তোমাকেই ইন্দ্রাণী করব। বিষ্ণু বললেন, খবরদার, তিলোত্তমার দিকে নজর দিও না, ও বৈকুণ্ঠে যাবে, আমার পদসেবা করবে। মহেশ্বর বললেন, ওহে বিষ্ণু, তোমার তো বিস্তর সেবাদাসী আছে, তিলোত্তমা আমার সঙ্গে
তিলোত্তমা
কৈলাসে যাবে, পার্বতীর একজন ঝি দরকার। তখন ব্রহ্মা বেগতিক দেখে বললেন, তিলোত্তমে, স্ফুট স্ফুট স্ফোটয় স্ফোটয়! তিলোত্তমা দড়াম করে ফেটে গেল অ্যাটম বোমার মতন। তার সমস্ত সত্তা বিশ্লিষ্ট হল, যে উপাদান যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই ফিরে গেল—কান্তি বিদ্যুৎলতায়, কেশরাশি মেঘমালায়, মুখচ্ছবি পূর্ণচন্দ্রে, দৃষ্টি মৃগলোচনে, ওষ্ঠরাগ পক্ব বিম্বে, দন্তরুচি কুন্দকলিকায়, কণ্ঠস্বর বেণুবীণায়, বাহু মৃণালদণ্ডে, পয়োধর বিল্বফলে, নিতম্ব করিকুম্ভে, উরু কদলীকাণ্ডে! পড়ে রইল শুধু একটু রেডিও-অ্যাকটিভ ধোঁয়া। অসিতা বলল, তিলোত্তমার মন কোথায় ফিরে গেল তা তো বললেন না স্যার। —তার মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার কিছুই ছিল না, আত্মাও ছিল না। তিলোত্তমা একটা রোবট। পুরাণকথা শেষ করে চঞ্চু মহাশয় প্রশ্ন করলেন, বৎস সিদ্ধিনাথ, এখন কিঞ্চিৎ সুস্থ বোধ করছ কি? মোহ অপগত হয়েছে? আমি লাফ দিয়ে উঠে বললুম, একদম সেরে গেছি স্যার। আমার মানসী তিলোত্তমাও এক্সপ্লোড করে বিলীন হয়েছে। চঞ্চু মহাশয় বললেন, এখনও বলা যায় না, কিছু ধোঁয়া থাকতে পারে। দেখ সিদ্ধিনাথ, তোমার চটপট বিবাহ হওয়া দরকার, তোমার বাপ মায়েরও সেই ইচ্ছা। আমার ছোট শালী নবদুর্গা দেখতে নেহাত মন্দ নয়, কাল বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসে তাকে একবার দেখো। আমি উত্তর দিলুম, দেখবার দরকার নেই স্যার। ছায়া দেখে একবার ভুলেছি, কায়া দেখে আর ভুলতে চাই না। ওই নবদুর্গা না বনদুর্গা কি নাম বললেন ওকেই বিয়ে করব। আপনি যখন বলছেন তখন আর কথা কি। চঞ্চু মহাশয় বললেন, ঠিক বলেছ সিদ্ধিনাথ। দশ মিনিট দেখে তুমি কি আর বুঝবে, আমি ত দশ বছরেও নবদুর্গার দিদি জয়দুর্গার ইয়ত্তা পাই নি। বিবাহ হয়ে যাক, তার পর ধীরে সুস্থে যত দিন খুশি দেখো। তার পর চঞ্চু মহাশয় বাবাকে বললেন, বাবা মা রাজী হলেন, দু মাসের মধ্যে নবদুর্গার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল। গোপালবাবু বললেন, সিদ্ধিনাথের ইতিহাস তো শেষ হল, এখন নমিতা তোমার মন্তব্য বলতে পার। নমিতা বললেন, আপনার গিন্নীকে এই কেচ্ছা শুনিয়েছেন? সিদ্ধিনাথ বললেন, শুনিয়েছি। আরও অনেক রকম জীবনস্মৃতি তাঁকে বলেছি, কিন্তু পতিবাক্যে তাঁর আস্থা নেই, আমার কোনও কথাই তিনি বিশ্বাস করেন না। —জীবনস্মৃতি না ছাই, বকবক করে আবোলতাবোল বানিয়ে বলেছেন। আগাগোড়া মিথ্যে, শুধু নবদুর্গা সত্যি।
১৩৬১ (১৯৫৪)