গল্পকল্প: চিরঞ্জীব
চিরঞ্জীব
পূজার ছুটিতে দুই বন্ধু হরিহর বসু আর তারক গুপ্ত পশ্চিমে বেড়াতে যাচ্ছেন। দিল্লি মেল ছাড়বার দেড় ঘণ্টা আগে তাঁরা হাওড়া স্টেশনে এলেন এবং প্ল্যাটফর্মে গাড়ি লাগতেই একটা সেকেন্ড ক্লাস কামরায় উঠে পড়লেন। তাঁদের সিট আগে থেকেই রিজার্ভ করা ছিল। হরিহরবাবু তাড়াতাড়ি তাঁর বিছানা পেতে গট হয়ে বসে বললেন, দেখ তারক, যে কদিন কলকাতার বাইরে থাকব সে কদিন বাঙালীর সঙ্গে মোটেই মিশব না। মেশবার দরকারও হবে না, কারণ দিল্লীতে আমরা লালা গজাননজীর বাড়িতে উঠছি। আগ্রাতে তাঁর গদি আছে, সেখানেও আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করেছেন। অতি ভাল লোক গজাননজী। তারকবাবু cigarette ধরিয়ে বললেন, লোক তো ভাল, কিন্তু তাঁর বাড়িতে নিরামিষ খেতে হবে। হরিহরবাবু বললেন, ওই তো বাঙালীর মহা দোষ, মাছের জন্যে বেড়ালের মতন ছোঁক- ছোঁক করে। তুমি আবার বাঙাল, আরও লোভী। আচ্ছা বাপু, পনের দিন না হয় বিধবার মতন থাকা যাবে। কিন্তু তুমিও তো প্রচণ্ড গোস্তখোর। —ক্রমশ মাছ মাংস ত্যাগ করছি। নিখিল ভারতের ভদ্রশ্রেণীর সঙ্গে আমাদের সাজাত্য হওয়া দরকার। —সাজাত্য আপনিই হচ্ছে, লালাজী শেঠজী চোবেজী সবাই মুরগি খেতে শিখছেন। মহামতি গোখলে ঠিকই বলে গেছেন— What Bengal thinks today India thinks tomorrow। বাঙালীর আর কষ্ট করে সাত্ত্বিক হবার দরকার নেই। —খুব দরকার আছে। উত্তরপ্রদেশ মধ্যপ্রদেশ গুজরাট মহারাষ্ট্র অন্ধ্র তামিলনাড প্রভৃতি রাজ্যের উচ্চ সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের সর্বাঙ্গীণ মিলন হওয়া দরকার। খাদ্য পরিচ্ছদ আর ভাষা বদলাতে হবে, নইলে মচ্ছি-চাওর-খোর বেঙ্গলী অপাঙক্তেয় হয়ে থাকবে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় ঠিক বলেছেন—বাঙালী আত্মবিস্মৃত জাতি। আমাদের পূর্বমর্যাদা স্মরণ করে পূর্বসম্বন্ধ পুনঃস্থাপন করতে হবে। —পূর্বসম্বন্ধটা কিরকম? আমরা সবাই আর্য-খোট্টা এই সম্বন্ধ? —তার চাইতে নিকটতর। আদিশূরের রাজত্বকালে কান্যকুব্জ থেকে যে পাঁচজন কায়স্থ বাংলা দেশে এসেছিলেন, তাঁদের নেতার নাম দশরথ বসু। তিনি আমার ছাব্বিশতম পূর্ব- পুরুষ। আসলে আমি বাঙালী নই, কনোজী লালা কায়েন্ত। তুমিও বাঙালী নও। —বল কি হে! —তুমি হচ্ছ কর্ণাটী ব্রহ্মক্ষত্রিয়, বল্লালসেনের স্বজাতি। ইতিহাস পড়ে দেখো। —আমি তো জানতুম আমি চন্দ্রগুপ্ত সমুদ্রগুপ্তের জ্ঞাতি। তোমাদের কথা শুনেছি বটে, আদিশূর কনোজ থেকে পাঁচজন বেদজ্ঞ আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ আনিয়েছিলেন, তাঁদের তল্পীদার হয়ে পাঁচ কায়স্থ এসেছিল।
—ভুল শুনেছ। আদিশূর রাজশাসনের জন্য পাঁচজন উচ্চবংশীয় ক্ষত্রকায়স্থ আনিয়ে- ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে পাঁচটি পাচক ব্রাহ্মণ এসেছিল। হরিহরবাবু তাঁর ঘড়িতে দেখলেন গাড়ি ছাড়তে আর পনের মিনিট দেরি আছে। তাঁর ব্যাগ খুলে দুটি খদ্দরের টুপি বার করলেন। একটি নিজে পরলেন আর একটি তারকবাবুকে দিয়ে বললেন, নাও, মাথায় দাও। তারকবাবু বললেন, টুপি পরব কেন, শুধু মাথা গরম করা। এই তো তুমি বললে যে আমি কর্ণাটী, অর্থাৎ মাদ্রাজ প্রদেশের লোক। আমরা টুপি পরি না, তার সাক্ষী রাজাজী। বরং কাছার একটা খুঁট খুলে রাখছি।
গাড়িতে হুড়মুড় করে লোক উঠতে লাগল। হরিহরবাবুদের কামরা ভরে গেল, বাঙালী বিহারী উত্তরপ্রদেশী মারোয়াড়ী গুজরাটী প্রভৃতি নানা জাতের লোক উঠে বেঞ্চিতে ঠাসা- ঠাসি করে বসে পড়ল। একটি বাঙালী যুবক একজন স্থবিরের হাত ধরে তাঁকে এক কোণে বসিয়ে দিয়ে বললে, হালদার মহাশয়, আপনাকে এখন একটু কষ্ট সইতে হবে। ঘণ্টা তিন-চার পরেরই লোক কমে যাবে, তখন আপনার বিছানা পেতে দেব। বৃদ্ধ হালদার মহাশয় বললেন, আমার জন্য ব্যস্ত হয়ো না শরৎ। বয়স হলেও তোমাদের চাইতে শক্ত আছি। দাঁত নেই, কিন্তু এখনও একটি আস্ত ইলিশ মাছ হজম করতে পারি। তারকবাবু বললেন, বাঃ আপনি মহাপুরুষ। বড্ড ভিড় নইলে আপনার পায়ের ধূলো নিতুম হালদার মহাশয়। হালদার খুশী হয়ে বললেন, তবে বলি শোন। মুঙ্গের জেলায় খড়গপুরে থাকতে দু-বেলায় একটি আস্ত পাঁঠা সাবাড় করতুম। চার আনায় একটি নধর বকাড়ি, আবার তার চামড়া বেচলে পুরোপুরি চার আনাই ফিরে আসত। একবার একটি সিকি খরচ করলে ক্রমান্বয়ে পাঁঠার পর পাঁঠা মুফতে পাওয়া যেত। ভারী লোভ হচ্ছে, নয়? এখন আর সেদিন নেই রে দাদা। ষাট বৎসর আগেকার কথা। গার্ডের বাঁশি ফুরুর্ করে বেজে উঠল। একজন প্রকাণ্ড পুরুষ দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন। হরিহরবাবু বললেন, আর জায়গা নেহি হ্যায়, দুসরা কামরায় যাইয়ে। গাড়ি চলতে লাগল। আগন্তুকের বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ, বৃষস্কন্ধ শালপ্রাংশু, কাল- বৈশাখীর মেঘের মতন গায়ের রং, বাবরি চুল, গাল পর্যন্ত জুলফি, মোটা গোঁফের নীচে পুরু ঠোঁট। পরনে মিহি ধুতি, কাছার এক কোণ ঝুলছে। গায়ে লম্বা রেশমি কোট, তার উপর ভাঁজ করা আজানুলম্বিত জরিপাড় উড়ুনি। কপালে রক্ত চন্দনের ফোঁটা, দুই কানে হীরার ফুল, আঙুলে অনেকগুলি নীলা চুনি পান্নার আংটি, পায়ে পনের নম্বর চপ্পল। ঝকঝকে সাদা দাঁত বার করে হেসে আগন্তুক পরিষ্কার বাংলায় হরিহরবাবুকে বললেন, ঘাবড়াবেন না মহাশয়, আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকব। পান খেয়ে পিক ফেলব না, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ব না, আশ্চর্য মাজন বেচব না, বন্যা ভূমিকম্পের চাঁদা চাইব না, সর্বহারার গানও গাইব না। যদি পরে ভিড় কমে তবে একটু বসবার জায়গা করে নেব। যদি অনুমতি দেন তবে আলাপ করে আপনাদের খুশী করবার চেষ্টা করব। শরৎ নামক ছেলেটি বললে, কতক্ষণ কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আপনি আমার পাশে বসুন। আগন্তুক কৃতজ্ঞতা সূচক নমস্কার করে বসে পড়লেন। হালদার মহাশয় বললেন, মহাশয়ের নামটি কি? নিবাস কোথায়? কি করা হয়? কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আগন্তুক উত্তর দিলেন, আমার নাম লঙ্কুস্বামী করূ রঙ্গ রোডি। আদি নিবাস ধ্বংস হয়ে
গেছে, এখন ভারতের নানা স্থানে ঘুরে বেড়াই। কিছু করি না, মহাদেব আর রামচন্দ্রের কৃপায় আমার কোনও অভাব নেই। এখন আসানসোলে শ্বশুদের কাছে যাচ্ছি, কাল অযোধ্যা- পুরী রওনা হব, নবরাত্রি উৎসব দেখতে। হরিহরবাবু বললেন, আপনি রেডি? ক্ষত্রিয়? —ব্রাহ্মণও বটে ক্ষত্রিয়ও বটে। —ও আপনি ব্রহ্মক্ষত্রিয়, আমাদের এই তারক গুপ্তের স্বজাতি? —তা বলতে পারি না। হরিহরবাবু চিন্তিত হয়ে বললেন, তবেই তো সমস্যায় ফেললেন মশায়! আপনি শর্মা, না বর্মা, না দাশ তালব্য-শ, না দাস দন্ত্য-স? আমি শর্মা-বর্মা-দাশ, দ-এ আকার মূর্ধন্য ষ। আমি জাতিতে মূর্ধ্যাভিষিক্ত। পিতা ব্রাহ্মণ, মাতা রক্ষঃক্ষত্রিয়া রাজকন্যা। রেডি আমার আসল উপাধি নয়, শুনতে মিন্ট বলে নামের শেষে যোগ করি। হালদার মশায় বললেন, আহা, কেন ভদ্রলোককে জেরা করে বিব্রত কর, দেখতেই তো পাচ্ছ ইনি মাদ্রাজী। আরও পরিচয়ের দরকার কি। আপনি তো খাসা বাংলা বলেন মশায়। শিখলেন কোথায়? লংকুস্বামী হেসে বললেন, আমার বতমানা পত্নী আট বৎসর শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তাঁর কাছেই বাংলা শিখেছি। হরিহরবাবু বললেন, বতমানা পত্নী? —আজ্ঞে হাঁ। পত্নীদেরও ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান আছে। হালদার মশায় বললেন, এই সোজা কথাটা বুঝলে না? ইনি অনেক বার সংসার করেছেন। এই আমার মতন আর কি। চার বার বিবাহ করেছি, কলাগাছ নিয়ে পাঁচ। কিন্তু এখন গৃহ শূন্য। আবার বিবাহ করবার ইচ্ছা আছে, কিন্তু শেষ পক্ষের সম্বন্ধী এই শরৎ শালার জন্যেই তা হচ্ছে না, কেবলই ভাঙচি দেয়। লংকুস্বামী বললেন, মহাশয়ের বয়স কত হয়েছে? —চার কুড়ি পুরতে এখনও ঢের বাকী। শরৎ বলে উঠল, মিথ্যে বলবেন না হালদার মশায়, সেই কবে আশি পেরিয়ে গেছেন। —তুই চুপ কর ছোঁড়া। বুঝলেন লংকুবাবু, বয়স যতই হোক খুব শক্ত আছি। এখনও একটি আস্ত ইলিশ হজম করতে পারি। লংকুস্বামী বললেন, তবে আর ভাবনা কি। আপনি তো বালক বললেই হয়, এক শ বার বিবাহ করতে পারেন। —হেঃ হেঃ। বালক নয়, তবে জোয়ান বলতে পারেন। মহাশয় ক বার সংসার করেছেন? লংকুস্বামী পকেট থেকে একটি নোটবুক বার করে দেখে বললেন, এখন ঊনবিংশাধিক- শততম সংসার চলছে। —তার মানে? অর্থাৎ এখন পর্যন্ত এক শ উনিশ বার বিবাহ করেছি। হালদার মশায় চোখ কপালে তুলে বললেন, প্রত্যেক বারে দশ বিশ গণ্ডা বিবাহ করে- ছিলেন নাকি? —না না, বহুবিবাহে আমার ঘোর আপত্তি, যদিও আমার বড়-দা আর মেজদার অনেক পত্নী ছিলেন। আমি চিরকালই একনিষ্ঠ, এক-একটি পত্নী গত হলে আবার একটির পাণি- গ্রহণ করেছি।
অভিশাপ দিলে ফলে না, আমি নির্বিষ ঢোঁড়া সাপ হয়ে গেছি। শিষ্যরা আমাকে ত্যাগ করেছে, আমি এখন ছন্নছাড়া হয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি বললুম, মহামুনি, শান্ত হ’ন, আপনি শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছেন। ভরত রাজা তো কবে স্বর্গলাভ করেছেন, তাঁর আর ঝুমঝুমির দরকার কি? আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে তপস্যা করুন, যোগ-সাধনা করুন, হরিনাম করুন। অথবা লোকশিক্ষার নিমিত্ত জীবন-স্মৃতি লিখুন, জটাশ্মশ্রুধারী উগ্রতপা মুনি-ঋষিদের সঙ্গে গ্ল্যামার গার্ল অপ্সরাদের মোলাকাত বিবৃত করুন, পত্রিকাওয়ালারা তা নেবার জন্য কাড়াকাড়ি করবে। ঝুমঝুমির কথা একেবারে ভুলে যান। —হায় হায়, ভোলবার জো কি! ওই ঝুমঝুমিই হচ্ছে মেনকার অভিশাপ, শকুন্তলার প্রতিশোধ। আমার মাথা খারাপ হ’য়ে গেছে, যখন তখন ঝুমঝুম শব্দ শুনি। দুর্বাসা হঠাৎ চিৎকার করে হাত পা ছুড়ে নাচতে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিনের ছেলে পন্টু তাঁর পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল—মেরে ফেললে রে, সব কটাকে মেরে ফেললে! ব্যাপার গুরুতর। পন্টু নিবিষ্ট হয়ে ঝুমঝুমির ইতিহাস শুনছিল। সেই অবকাশে ইঁদুরগুলো তার পকেট থেকে বেরিয়ে দুর্বাসাকে আক্রমণ করেছে। দুটো তাঁর কাঁধে উঠেছে, একটা অধোবাসে ঢুকে গেছে, আর একটা কোথায় আছে দেখা যাচ্ছে না। তাঁর নাচের ঝাকুনিতে তিনটে ইঁদুর নীচে পড়ে গেল। পন্টু কোনও রকমে সেগুলোকে দুর্বাসার পদাঘাত থেকে রক্ষা করলে। দুর্বাসা বললেন, তুই অতি দুর্বিনীত বালক। পুলিন বললে, টেক কেয়ার তপোধন, আমার ছেলেকে যদি শাপ দেন তো ভাল হবে না বলছি।
দুর্বাসা বললেন, ইঁদুর পোষা মহাপাপ, চণ্ডালেও পোষে না। পন্টু রেগে গিয়ে বললে, বা রে, আপনি যে নিজের গায়ে ছারপোকা পোষেন তা বুঝি খুব ভাল? দেখ না বাবা, ঋষি মশায়ের গা থেকে কত ছারপোকা আমাদের বিছানায় এসেছে। আর একটা ইঁদুর কোথা গেল? খুঁজে পাচ্ছি না যে— দুর্বাসা আবার চিৎকার করে নাচতে লাগলেন। পন্টু বললে, ওই ওই, দাড়ির ভেতর একটা সেঁধিয়েছে। অনুমতি না নিয়েই পন্টু দুর্বাসার দাড়িতে হস্তক্ষেপ করে তার ভেতর থেকে ইঁদুরটাকে টেনে বার করলে। তার পর বললে ঝুমঝুম শব্দ হচ্ছে কেন? আমি লাফিয়ে উঠে বললুম, ঝুমঝুম শব্দ? বলিস কি-রে! প্রভু, আপনার দাড়িটি একবার নাড়ুন তো। দুর্বাসা দাড়ি নাড়লেন। সেই নিবিড় শ্মশ্রুজাল ভেদ করে ক্ষীণ শব্দ নির্গত হল—ঝুম ঝুম ঝুম। যেন নৃত্যপরা মেনকার নূপুরনিক্বণ দূরদূরান্তর থেকে ভেসে আসছে। পুলিন দাড়ির নীচের ঝুঁটিটা একবার টিপে দেখলে, তার পর গেরো খুলতে লাগল। দুর্বাসা বললেন, আরে লাগে লাগে! কে তাঁর কথা ওনে, আমি তাঁর মাথাটি জোর করে ধরে রইলুম, পুলিন পড়পড় করে দাড়ি ছিঁড়ে ভেতর থেকে ঝুমঝুমি বার করলে। সোনার কি রূপোর কি টিনের বোঝা গেল না, ময়লায় কালো হয়ে গেছে, কিন্তু বাজছে ঠিক। পন্টু চুপি চুপি বললে, এক্স-রে করলে কোন্ কালে বেরিয়ে পড়ত, নয় বাবা? পন্টুর অভিজ্ঞতা আছে, বছর দুই আগে সে একটা পয়সা গিলেছিল।
একজন গুজরাটী যাত্রী সশব্দে হেসে বললেন, বুঝছেন না হালদার মোসা, ইনি আপনাকে বিয়া পাগল বুড়া ঠাহরেছেন, তাই আপনার পায়ের খিঁচছেন, যাকে বলে লেগ পুলিং। লংকুস্বামী তাঁর বৃহৎ জিহ্বা দংশন করে বললেন, রাম রাম, আমি ঠাট্টা করছি না, সত্য কথাই বলছি। গাড়ী বর্ধমানে পৌঁছল, অনেক যাত্রী নেমে গেল। লংকুস্বামী বললেন, এখন একটু জায়গা হয়েছে, আপনাদের যদি অসুবিধা না হয় তবে আমার স্ত্রীকে মহিলা-কামরা থেকে নিয়ে আসি। সেখানে বড় ভিড়, তাঁর কষ্ট হচ্ছে। ঘণ্টা-দুই পরেই আমরা আসানসোলে নেমে যাব। শরৎ বললে, কোনও অসুবিধা হবে না, আপনি তাঁকে নিয়ে আসুন। লংকুস্বামী তাঁর পত্নীকে নিয়ে এলেন। বয়স আন্দাজ পঁচিশ, সুশ্রী তন্বী শ্যামা, কাছা দিয়ে শাড়ি পরা, মাথা খোলা, দুই কানে আর নাকের দুই পাশে হীরে ঝকমক করছে। লংকু- স্বামী পরিচয় দিলেন, এই ইনিই আমার এক শ উনিশ নম্বরের স্ত্রী, এঁর নাম সূরাত্মা বাঈ। সূরাত্মা স্মিতমুখে সকলের উদ্দেশে নমস্কার করলেন। হালদার মশায় চুলবুল করছেন আর তাঁর ঠোঁট বার বার নড়ছে দেখে লংকুস্বামী বললেন, আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান কি? স্বচ্ছন্দে বলুন, আমার স্ত্রীর জন্য কোনও দ্বিধা করবেন না। হালদার মশায় বললেন, এক শ উনিশ বার বিবাহ করা চাট্টিখানি কথা নয়, আপনার বয়স কত হবে লংকুবাবু? —আপনি আন্দাজ করুন না। —আমার চাইতে কম। এই পঞ্চাশের মধ্যে আর কি। —হল না, আরও উঠুন। —ষাট? —আরও, আরও! —সত্তর? আশি? তারকবাবু হেসে বললেন, আপনার কাজ নয় হালদার মশায়। নিলামের দর চড়ানো আমার অভ্যাস আছে। লংকুস্বামীজী আপনার বয়স এক শ। —হল না, আরও উঠুন। —পাঁচ শ? হাজার? দশ হাজার? —আরও, আরও। —চার হাজার? পাঁচ হাজার? লংকুস্বামী বললেন, এইবার কাছাকাছি এসেছেন। সূরাত্মা, তুমি তো সেদিন হিসেব করেছিলে তোমার চাইতে আমি ক বছরের বড়। তুমি বাবু মহাশয়দের শুনিয়ে দাও আমার বয়স কত। সূরাত্মা সহাস্যে মৃদুস্বরে বললেন, পাঁচ হাজার পাঁচ শ পঞ্চাশ। হালদার মশায় হাঁ করে নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। হরিহরবাবু হতভম্ব হয়ে ভাবতে লাগলেন, স্বপ্ন দেখছি, না জেগে আছি? অন্য যাত্রীরা নির্বাক হয়ে রইল, কেউ কেউ বোকার মতন হাসতে লাগল। তারকবাবু বললেন, ক বছর অন্তর বিবাহ করেছিলেন মহাশয়?
দুর্বাসা একটি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, একেই বলে গেরোর ফের। ঝুমঝুমিটি যে যত্ন করে দাড়ির গেরোর মধ্যে গুঁজে রেখেছিলুম তা মনেই ছিল না। তার পর পন্টুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, বৎস, আমি আশীর্বাদ করছি তুমি রাজা হবে। আমি বললুম, ও আশীর্বাদ আর ফলবার উপায় নেই প্রভু, রাজাতন্ত্র লোপ পেয়েছে। বরং এই আশীর্বাদ করুন যেন ও মন্ত্রী হতে পারে, অন্তত পাঁচ বছরের জন্য। —বেশ সেই আশীর্বাদ করছি। কিন্তু রাজা না থাকলে রাজকার্য চলবে কি করে? —আজকাল তা চলে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে কর্তা না থাকলেও ক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়। দুর্বাসা বললেন, আমি এখন উঠি। যাঁর জিনিস তাঁকে অর্পণ করে সত্বর দায়মুক্ত হয়ে ব্রহ্মলোকে যেতে চাই। —অর্পণ করবেন কাকে? —কেন; মহারাজ ভরতের বংশধর নেই? —কেউ নেই, ভরতবংশ অর্থাৎ যুধিষ্ঠির-পরীক্ষিতের বংশ লোপ পেয়েছে। তাঁদের যাঁরা উত্তরাধিকারী—নন্দ মৌর্য শুঙ্গ অন্ধ্র গুপ্ত প্রভৃতি, তার পর পাঠান মোগল ইংরেজ, এঁরাও ফৌত হয়েছেন। ভারতের রাজ্য এখন দুভাগ হয়েছে, বড়টি ভারতীয় গণরাজ্য, ছোটটি ইসলামীয় পাকিস্তান। —একজন চক্রবর্তী রাজা আছেন তো? —এখন আর নেই, দুই রাজ্যে দুই রাষ্ট্রপতি বাহাল হয়েছেন, একজন দিল্লীতে আর একজন করাচিতে থাকেন। আইন অনুসারে এরাই ভরতের স্থলাভিষিক্ত, সুতরাং ঝুমঝুমিটি এঁদেরই হক পাওনা। কিন্তু দেবেন কাকে? একজনকে দিলে আর একজন ইউ-এন-ও-তে নালিশ করবেন, না হয় যুদ্ধ বাধিয়ে বলবেন, লড়কে লেঙ্গে ঝুমঝুমি। দুর্বাসা ক্ষণকাল ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন। তার পর মট্ করে ঝুমঝুমিটি ভেঙে বললেন, একজনকে দেব এই খোলটা যাতে পাথরকুচি আছে, নাড়লে কড়মড় করে। আর একজনকে দেব এই ডাঁটিটা, ফুঁ দিলে পিং পিং করে। দাও তো গোটা দশ টাকা রাহাখরচ। টাকা নিয়ে দুর্বাসা তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।
১৩৫৮ ( ১৯৫১ )
লংকুস্বামী আবার তাঁর নোটবুক দেখে বললেন, গড়ে ছেচল্লিশ বৎসর অন্তর। আমার স্ত্রীদের আয়ু তো আমার মতন ছিল না, সকলেই যথাকালে গত হয়েছিলেন। অষ্টম হেনরির মতন আমি স্ত্রীবধ করি নি। আমার সকল স্ত্রীই সতীলক্ষ্মী। হালদার মশায় ক্ষীণস্বরে প্রশ্ন করলেন, সন্তানাদি কতগুলি? —সুরাত্মার এখনও কিছু হয়নি। আমার পূর্ব পূর্ব পক্ষের সন্তানদের হিসাব রাখি নি, রাখা সাধ্যও নয়। বিস্তর জন্মেছিল, বিস্তর মরে গেছে, তবে জীবিত বংশধরদের সংখ্যা এখন কয়েক লাখ হবে। তারকবাবু বললেন, যত রেডি, পিল্লে মেনন নাইডু নায়ার চোট্টি আয়ার আয়েঙ্গার সবাই আপনার বংশধর নাকি? —শুধু ওরা কেন। চাটুজ্যে বাঁড়ুজ্যে ঘোষ বোস সেন আছে, সিং কাপুর চোপরা মেটা দেশাই আছে, শেখ সৈয়দ আছে, হোর লাভাল কুইসলিং আছে, চ্যাং কিমাগুস্যা ভডকুইস্কি প্রভৃতিও আছে! সাড়ে পাঁচ হাজার বৎসরে মানুষের জাতিগত পরিবর্তন অনেক হয়। —আপনি তা’হলে মহেঞ্জোদাড়ো হরপ্পা যুগের লোক। —তা বলতে পারেন। ওইসব দেশবাসীর সঙ্গে আমার পূর্ব-পুরুষদের কুটুম্বিতা ছিল। আমার বৃদ্ধপ্রমাতামহীর নাম সালকটংকটা, তিনি হরপ্পার রাজবংশের কন্যা ছিলেন। হরিহরবাবু এতক্ষণে একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে বললেন, উঃ, দীর্ঘ জীবনে আপনার বিস্তর স্বজনবিয়োগ হয়েছে, কতই না শোক পেয়েছেন! —শোক পাব কেন? কৃষকের আয়ু ধানগাছের চাইতে বেশী। ধানগাছ শস্য দিয়ে মরে যায়, তার জন্য কৃষক কিছুমাত্র শোক করে না, আবার বীজ ছড়ায়। হরিহর বললেন, ওঃ, সাড়ে পাঁচ হাজার বৎসরের ইতিহাস আপনার চোখের সামনে ঘটে গেছে! হাঁ। পলাশীর যুদ্ধ, পৃথ্বীরাজের পরাজয়, হর্ষবর্ধনের দিগ্বিজয়, আলেকজান্ডারের আগমন, বুদ্ধদেবের জন্ম, কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ, সবই আমি দেখেছি। রাম-রাবণের যুদ্ধও দেখেছেন? লংকুস্বামী গম্ভীর হয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তাও দেখতে হয়েছে। শুধু দেখা নয়, লড়তেও হয়েছে। ও কথা আর তুলবেন না। হরিহরবাবু রোমাঞ্চিত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে প্রশ্ন করলেন, আপনি কে প্রভু। গুজরাটী ভদ্রলোকটি উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। দুই উরুতে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে বললেন, ও হো হো হো! আমি বুঝে নিয়েছি আপনি হচ্ছেন বিভীষণ মহারাজ, রামচন্দ্রের বরে চিরঞ্জীব হয়েছেন। এখন একটি বাত বলছি শুনেন। আমার নাম শুনে থাকবেন, লগনচাঁদ বজাজ, নয়নসুখ ফিলিম কোম্পানির মালিক। নয়া ফিলিম বানাচ্ছি—রাবণ-সংহার। রোশেনারা পকোড়িলাল সাগরবালা এঁরা সব নামছেন। আপনারা আমার কোম্পানিতে জইন করুন। খুদ আমি রামচন্দ্রের পার্ট লিব। আপনি বড়দাদা রাবণের পার্ট লিবেন, সুরাত্মা বাঈ সীতার পার্ট লিবেন। হাজার টাকা করে মহীনা দিব। এই আমার কার্ড। বিচার করে দেখবেন, রাজী হন তো এক হপ্তার অন্দর এই ঠিকানায় আমাকে তার ভেজবেন। আচ্ছা? লংকুস্বামী একবার কটমট করে তাকালেন। লগনচাঁদ থতমত খেয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর হাত থেকে কার্ডখানা খসে পড়ে গেল। এই সময়ে গাড়ি আসানসোলে এসে থামল। সপত্নীক লংকুস্বামী কোন কথা না বলে যুক্ত করে বিদায় নিলেন এবং বাঘের মতন নিঃশব্দে পা ফেলে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লেন।
১৩৫৭ ( ১৯৫১ )
যৌবনে
ধুস্তরীমায়া
ইত্যাদি গল্প