ধূস্তরী মায়া ইত্যাদি গল্প: রটন্তীকুমার
রটাই বললে, কই আবার অসভ্য হলুম! শুধু বলছিলুম, তুমি খুব ভাল খাবার করতে পার। তা বুঝি অসভ্যতা হল? আচ্ছা, তুমি খাবার পার না, গান পার না, সেতার পার না, মোটেই কিচ্ছু পার না। জান বড়দি, খগেনবাবুর মোটরে কিচ্ছু শব্দ হয় না, ঝাঁকুনিও লাগে না। খগেন বললে, চল না, আমার সঙ্গে একটু বেড়িয়ে আসবে। তার পর তোমাকে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়ে যাব এখন। মহা উল্লাসে রটাই হনুমানের মতন হুপ শব্দ করে গাড়িতে চড়ে বসল। তার মা আর দিদিদের কাছে বিদায় নিয়ে এবং আবার আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে খগেন চলে গেল।
যেতে যেতে রটাই খগেনকে বললে, দেখুন, রুবি-দি হচ্ছে একদম বাজে, তার মা আরও বাজে। আপনি আমার বড়দির সঙ্গেই ভাব করুন। খগেন বললে, নেহাত বাজে কথা বলনি রটাই। কেমন করে ভাব করতে হয় আমাকে শিখিয়ে দিতে পার? ওঃ হো, তোমার বাজী জেতার কথা ভুলে গিয়েছিলুম, এই নাও। টাকা দুটো পকেটে পুরে রটাই বললে, আমরা ইস্কুলে কি করে ভাব করি জানেন? মনে করুন একটা নতুন ছেলে এসেছে। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, এই তোর নাম কিরে? সে বললে, হাবলু। আমি তার পিঠ চাপড়ে বললুম, হাবলু, তোর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল, এই নে দুটো লাল কাঁচের গুলি। আবার আড়ি করা আরও সহজ, দাড়িতে তিন বার বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে বলতে হয়—আড়ি আড়ি আড়ি। —খাসা নিয়ম। তোমার রুবি-দির সঙ্গে ওই রকমে ভাব হতে পারে, তিনি মুখিয়ে আছেন কিনা। কিন্তু তোমার জয়ন্তীমালা দিদিমণিটি অন্য রকমের, পিঠ চাপড়ে ভাব করা যাবে না। তাঁর মতন রমণীর মন সহস্র বর্ষেরই সখা সাধনার ধন। যা হক, আমি চেষ্টা করে দেখব। কিন্তু হাজার বছর সাধনা করা তো চলবে না, আমার বাবা মা বিয়ের জন্য তাড়া লাগিয়েছেন যে। বলেছেন, যাকে খুশি বিয়ে কর, কিন্তু বোকার মতন পছন্দ ক’রো না, আর বেশী দেরি না হয়; মাঘ মাসে আমরা তীর্থভ্রমণে বেরুব, তার আগেই বিয়ে দিতে চাই। দেখি তার মধ্যে কিছু করতে পারি কিনা। শোন রটাই, তুমি বড় ব্যস্তবাগীশ, তোমার দিদিমণিকে ভাব করবার জন্য বকিও না যেন। —উরে বাবা! তা হলে আমার পিঠে দাদাম কিল মারবে। —আমাকেও মারবে না তো? —নাঃ, আপনাকে কিচ্ছু বলবে না।
বেড়ানো শেষ হলে রটাইকে তার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে খগেন চলে গেল। তার পর সে প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য এক মাসের মধ্যে একবার মাণিকদের বাড়ি এবং তিনবার রটাইদের বাড়ি গেল। খগেন বড় মুশকিলে পড়ল। রুবির মা বার বার তাকে আসবার জন্য বলে পাঠাচ্ছেন, এদিকে রটাইএর আবদার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ছেলেমানুষের কথা ঠেলা যায় না, অগত্যা রটাইদের বাড়িতে খগেন ঘন ঘন যেতে লাগল। দিন কতক পরে রটাই জিজ্ঞাসা করলে, ভাব হল? খগেন বললে, ধীরে রটন্তীকুমার, ধীরে। পণ্ডিতেরা বলেন, পথ হাঁটা, কাঁথা সেলাই, আর পাহাড় টপকানো শনৈঃ শনৈঃ মানে আস্তে আস্তে করতে হয়। ভাব করাও সেই রকম, তাড়াহুড়ো চলে না। বাবা যদি আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করতেন তবে এত দিন কোন্ কালে
ভাব হয়ে যেত। তা তে তিনি করবেন না, আবার তাঁর টাকাও বিস্তর আছে, সব আমিই পাব। এই হয়েছে বিপদ।
—বিপদ কেন? টাকা থাকা তো ভালই, কত রকম মজা করা যায়, আইসক্রীম, চকোলেট, মোটর গাড়ি, দম দেওয়া ইঞ্জিন, ব্যাডমিন্টন, পিংপং, লুডো, আরও কত কি।
—তোমার দিদি যে তা বোঝেন না। তাঁর বিশ্বাস, সমান সমান না হলে ভাব করা ঠিক নয়। আমি তাঁকে বলি, তুমিই বা কিসে কম? দেখতে আমার চাইতে ঢের ভাল, বিদ্যেতেও বেশী। তোমার দাদামশাই তো বলেই দিয়েছেন তুমি হচ্ছ লক্ষ্মী সরস্বতী আর অন্নপূর্ণার অ্যাভারেজ। তুমি চমৎকার গাইতে পার, আমার গলা টিপলেও সারেগামা বেরুবে না। তুমি হরেক রকম খাবার করতে জান, মায় ল্যাংড়া আমের ল্যাংচা, আর আমি পাঁউরুটি কাটতেও জানি না। তবু তোমার দিদিমণি খুঁতখুঁত করছেন। যা হোক, তুমি ভেবো না রটাই, সব ঠিক হয়ে যাবে, দিন কতক সবুর কর।
পাঁচ দিন পরে রটাই আবার প্রশ্ন করলে, ভাব হল?
খগেন বললে, আর একটু দেরি আছে।
রটাই বিরক্ত হয়ে বললে, এত দিনেও ভাব হল না? আমার সঙ্গে তো আপনার এক মিনিটে ভাব হয়েছিল। বড়দির ভারী অন্যায়, আপনি তাকে বলুন, তিন দিনের মধ্যে যদি ভাব না করে তবে আড়ি হয়ে যাবে।
—ওহে রটন্তীকুমার, ধৈর্যং রহু ধৈর্যং। আমি যদি লঙ্কেশ্বর রাবণ হতুম তো আল্টিমেটাম দিতুম যে তিন দিনের মধ্যে ভাব না করলে তাকে কাটলেট বানিয়ে খেয়ে ফেলব। কিন্তু তা তো পারব না। তাড়াহুড়ো লাগালে তোমার দিদিমণি ভড়কে যাবেন, হয়ত রেগে গিয়ে তাঁর কোন ক্লাসফ্রেণ্ড তরুণকুমার কি করুণকুমারের সঙ্গেই ভাব করে ফেলবেন। আমিও তখন মরিয়া হয়ে রুবি-দির কাছেই যাব—
তিড়বিড় করে হাত পা ছুঁড়ে রটাই বললে, খবরদার যাবেন না বলছি! বেশ, আরও কিছুদিন দেখুন।
তিন দিন পরে রটাই আবার প্রশ্ন করলে, হল?
খগেন বললে, এইবারে হব হব। তোমার দিদিমণিকে বলেছি, টাকার জন্য ভাবছ কেন, ও তো বাবার টাকা। আমার হাতে এলে তিন দিনে ফুঁকে দেব। যদি মামুলি উপায় পছন্দ না কর তবে হাসপাতাল আছে, ইস্কুল কলেজ আছে, রামকৃষ্ণ মিশন গৌড়ীয় মঠ আছে, হরেক রকম গুরু মহারাজের আখড়া আছে, যেখানে বলবে দিয়ে দেব। তার পর হাত খালি করে কপোত-কপোতী যথা উচ্চবৃক্ষচূড়ে বাঁধি নীড় থাকে সুখে, সেই রকম ফূর্তিতে থাকা যাবে।
—কিন্তু মোটর কার তো চাই?
—চাই বইকি। তাতে চড়েই তো মুষ্টিভিক্ষা করতে বেরুব, খুদ-কুঁড়ো যা আনব তাই দিয়ে তোমার দিদি পোলাও রাঁধবেন। আর দেখ, আমাদের কুটীরের সঙ্গে লাগাও একটা মস্ত তিন-তলা ধর্মশালা থাকবে, তুমি আর মানিক কেল্টে ভুল্টু বাবলু প্রভৃতি তোমার বন্ধুবর্গ মাঝে মাঝে এসে সেখানে বাস করবে। তার সামনেই একটি চমৎকার খেলার মাঠ—
—উঃ কি মজা! আর দেরি করবেন না, চটপট ভাব করে ফেলুন।
দেরি হল না। তিন দিন পরে ইস্কুলে মানিক বললে, হারে রটাই, খগেনবাবু নাকি খালি খালি তোদের বাড়ি যায়? রটাই সগর্বে উত্তর দিলে, যাবেই তো, বড়দির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে যে।
কিন্তু এই ভাব হওয়ার ফলে রটাইদের বাড়ির লোকের সঙ্গে মানিকদের বাড়ির লোকের
ভীষণ আড়ি হয়ে গেল। রুবির মা কেলেটের পিসীকে বললেন, উঃ, কি বেহায়া গায়ে পড়া মেয়ে এই জয়ন্তীটা, —জানা নেই শোনা নেই একটা বজ্জাত বিশ্ববকাট ছোকরা খগেন, তাকেই ভেড়া বানালে গা! কেলেটের পিসী বললেন, মুখে আগুন, ঝাটা মার, ঝাটা মার। জয়ন্তীর বিয়েতে মানিকদের বাড়ির কেউ এল না, কিন্তু কেলেটেদের সবাই এল, মায় তার পিসী। তিনি ঝাটা নিয়ে যান নি, আঁচলের ভেতর একটা থলি নিয়ে গিয়েছিলেন। পিসী অল্পে তুষ্ট, শুধু ভাঁড়ার থেকে গণ্ডা-পাঁচেক কড়া-পাক সন্দেশ আর জয়ন্তীর উপহার-সামগ্রী থেকে খান দুই রসাল গল্পের বই সরিয়েছিলেন।
১৩৫৯ (১৯৫২)