আনন্দীবাঈ ইত্যাদি গল্প: চিঠিবাজি

তোমার আয়। মাইনে কত পাও হে? দু শ? পরে আড়াই শ হবে? খেপেছ, ওই টাকায় চকোরীকে পুষতে চাও? তার সাবান ক্রীম পাউডার পেণ্ট লিপস্টিক সেট এই সব খরচই তো মাসে আড়াই শ-র ওপর। তুমি হয়তো ভেবেছ মেয়-জামাইয়ের ভরণ-পোষণের জন্যে আমি মাসে মাসে মোটা টাকা দেব। সেটি হবে না বাপু।

বংশীধর বলল, আমি গরিব বলেই ক্ষতি কি কাকাবাবু? চকোরী আপনার একমাত্র সন্তান, সে যাতে সুখে থাকে তার জন্যে আপনি অর্থসাহায্য করবেন এ তো স্বাভাবিক। আপনার অবর্তমানে ওই তো সব পাবে।

—অবর্ত্তমান হতে ঢের দেরি হে, আমি এখনও চল্লিশ বছর বাঁচব, তার আগে এক পয়সাও হাতছাড়া করব না। মেয়ে যদিদন আইবুড়ো তদ্দিন আমার খরচে নবাবি করুক আপত্তি নেই, কিন্তু বিয়ের পর সমস্ত ভার তার স্বামীকে নিতে হবে। আর যদিই বা তোমাদের খরচ আমি যোগাই তাতে তোমার মাথা হেট হবে না? বাপের মাইনের গোলাম স্বামীর ওপর কোনও মেয়ের শ্রদ্ধা থাকে না। আমিই বা চ্যারিটি-বয় জামাই করতে যাব কেন?

বংশীধর কাতর স্বরে বলল, তবে কি আমার কোনও আশা নেই?

—আশা থাকতে পারে। তুমি উঠে পড়ে লেগে যাও যাতে তোমার রোজগার বাড়ে। তোমার মাসিক আয় আড়াই হাজার হলেই আমার আর আপত্তি থাকবে না।

—অত টাকা আয়ের তো কোনও আশা দেখছি না। আর, চকোরী কি তত দিন সবুর করবে?

—সবুর করবে কিনা আমি কি করে বলব। তুমিই তার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পার। হাঁ, আর একটা কথা তোমার জেনে রাখা দরকার। চকোরীকে ভাঁওতা দিয়ে রাজী করিয়ে যদি আমার অমতে তাকে বিয়ে কর তবে আমার সমস্ত সম্পত্তি হরিণঘাটায় দান করব, গো-মহিষ-ছাগাদি পশু আর হংস-কুক্কুটাদি পক্ষীর উৎকর্ষকল্পে। আর, চকোরী আমার সম্পত্তি পেলেই বা তোমার কি সুবিধে হবে? সে অতি ঝানু মেয়ে, কাউকেও বিশ্বাস করে না, ব্যাঙ্কের চেক্‌বুক তোমাকে দেবে না, বিষয় যা পাবে তাতেও তোমাকে হাত দিতে দেবে না। বড় জোর তোমার সিগারেটের খরচ যোগাবে আর জন্মদিনে কিছু উপহার দেবে, এক লুট ভাল পোশাক, কি রিস্টওয়াচ, কিংবা একটা শার্পার-নাইণ্ট কলম। চকোরীকে বিয়ে করার মতলব ছেড়ে দেওয়াই তোমার পক্ষে ভাল।

বংশীধর বিষণ্ণ মনে চলে গেল। বিকাল বেলা তার কাছে সব কথা শুনে চকোরী বলল, বাবা যে ওই রকম বলবেন তা আমি আগে থাকতেই জানি।

বংশীধর বলল, চকোরী, তোমার বাবার সম্পত্তি তাঁরই থাকুক, আমার তাতে লোভ নেই। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালবাস তবে ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে না? প্রেমের জন্যে নারী কি না ছাড়তে পারে? যদি ভালবাসা থাকে তবে আমার সেকেলে ছোট বাড়িতে আর সামান্য আয়েই তুমি সুখী হতে পারবে।

চকোরী হেসে বলল, শোন বংশী। প্রেম খুব উঁচুদরের জিনিস, আর তোমার ওপর আমার তা নেহাত কম নেই। কিন্তু টাকাহীন প্রেম আর চাকাহীন গাড়ি দুইই অচল, কষ্টের সংসারে ভালবাসা শুকিয়ে যায়। 'ধনকে নিয়ে বনকে যাব থাকব বনের মাঝখানে, ধনদৌলত চাই না শুধু চাইব ধনের মুখপানে'—এ আমার পোষাবে না বাপু। তোমাকে ভয় দেখিয়ে তাড়াবার জন্যে বাবা অবশ্য অনেকটা বাড়িয়ে বলেছেন, আমাকে একবারে হার্টলেস রাক্ষসী বানিয়েছেন। কিন্তু আমি অতটা বেয়াড়া নই।

তবে বাবা নিতান্ত অন্যায় কিছু বলেন নি। আমি বলি কি তোমার ওই প্রোফেসরি ছেড়ে দিয়ে কোনও ভাল চাকরির চেষ্টা কর। বাবার সঙ্গে মন্ত্রীদের আলাপ আছে, ওঁকে ধরলে নিশ্চয় একটা ভাল পোস্ট তোমাকে দেওয়াত পারবেন। প্রথমটা মাইনে কম হলেও পরে আড়াই-তিন হাজার হওয়া অসম্ভব নয়।

—তত দিন আমার জন্যে তুমি সবুর করে থাকবে?

—গ্যারান্টি দিতে পারব না। অক্ষয় প্রেম একটা বাজে কথা, ভবিষ্যতে তোমার আমার দুজনেরই মতিগতি বদলাতে পারে। যা বলি শোন। একটা ভাল সরকারী চাকরির জন্যে নাছোড়বান্দা হয়ে বাবাকে ধর। কিন্তু এখনই নয়, তাঁর মাথার এখন ঠিক নেই, দিনরাত ওই মোষটার কথা ভাবছেন। বাবার গুপ্তচর খবর এনেছে, তালদিঘির সেই মহিম বাঁড়ুজ্যের মুলতানী মোষ নাকি রোজ সাড়ে কুড়ি সের দুধ দিচ্ছে, আমাদের রাজমহিষীর চাইতে কিছু বেশী, যদিও দুটোই সমবয়সী তরুণী মোষ। বাবা তাই উঠে পড়ে লেগেছেন, রাজমহিষীকে কাপাস বিচির খোল, চীনা-বাদাম, পালং শাক, কড়াইশুঁটি, গাজর, টোম্যাটো, নারকেল-কোরা, কমলালেবুর রস, এই সব পুষ্টিকর জিনিস খাওয়াচ্ছেন, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সও দিচ্ছেন। এগজিবিশনটা আগে চুকে যাক। রাজমহিষী যদি গোল্ড মেডেল পায় তবে বাবা খুব দিল-দরিয়া হবেন, তখন তাঁকে চাকরির জন্যে ধরবে।

আর এক মাস পরেই পশ্চিমবঙ্গ-গবাদি-পশু-প্রদর্শনী, কিন্তু হংসেশ্বর মহা বিপদে পড়েছেন, রাজমহিষী খাওয়া প্রায় ত্যাগ করেছে, দুধও নামমাত্র দিচ্ছে। যত নষ্টের গোড়া ওই গোপীরাম, রাজমহিষীর প্রধান সেবক। সে তার ইয়ারদের সঙ্গে রাসপূর্ণিমায় মেলায় গিয়ে খুব তাড়ি খেয়ে হাঙ্গামা বাধিয়েছিল, পুলিস এলে তাদের সঙ্গে বীরদর্পে লড়ে একটা কনস্টেবলের মাথা ফাটিয়েছিল। তার ফলে তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় চালান দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তাকে খালাস করবার জন্যে হংসেশ্বর অনেক চেষ্টা করলেন, কলকাতা থেকে ভাল ব্যারিস্টার পর্যন্ত আনালেন। আদালতে তিনি প্রার্থনা করলেন, মোটা জরিমানা করে আসামীকে ছেড়ে দেওয়া হক। কিন্তু হাকিম তা শুনলেন না, ছ মাস জেলের হুকুম দিলেন। তখন ব্যারিস্টার বললেন, ইয়োর অনার, এই গোপীরাম যদি জেলে যায় তবে শ্রীহংসেশ্বর রায়ের সর্বনাশ হবে। তাঁর বিখ্যাত চ্যাম্পিয়ান বাফেলো রাজমহিষী গোপীরামের বিরহে খাওয়া বন্ধ করেছে। না খেলে সে আগামী ক্যাটল শো-তে দাঁড়াবে কি করে? অতএব ইয়োর অনার, দয়া করে মোটা জামিন নিয়ে আসামীকে এক মাসের জন্যে ছেড়ে দিন, প্রদর্শনী শেষ হলেই সে জেলে ঢুকবে। কিন্তু হাকিমটি অত্যন্ত একগুঁয়ে আর অবুঝ, কোনও আবদার শুনলেন না। তাই গোপীরাম এখন জেলে রয়েছে।

হংসেশ্বর পূর্বে বুঝতে পারেন নি যে মোষটা গোপীরামের এত নেওটা হয়ে পড়েছে। এখন তিনি অকূল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছেন। গোপীরামের সহকারীরা কেউ ভয়ে এগোয় না, কাছে গেলেই রাজমহিষী গুঁতোতে আসে। শুধু হংসেশ্বরকে সে কাছে আসতে আর গায়ে হাত বুলোতে দেয়, কিন্তু তিনি খুব সাধাসাধি করেও তাকে খাওয়াতে পারলেন না।

হংসেশ্বরের এই সংকট শুনে বংশীধর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল। তিনি তখন এক ছড়া সিঙ্গাপুরী কলা মোষের নাকের সামনে ধরে লোভ দেখাচ্ছেন আর খাবার জন্যে অনুনয় করছেন, কিন্তু মোষ ঘাড় ফিরিয়ে নিচ্ছে।

বংশীধর বলল, কাকাবাবু, আমি কোনও সাহায্য করতে পারি কি? হংসেশ্বর খেঁকিয়ে বললেন, গুঁতো খাবার ইচ্ছে হয় তো এগিয়ে আসতে পার। হঠাৎ বংশীধরের মাথায় একটা মতলব এল। হংসেশ্বরের কাছ থেকে সরে এসে সে গোপীরামের সহকারীদের সঙ্গে কথা কয়ে রাজমহিষী সম্বন্ধে অনেক খবর জেনে নিল। তার পরদিন ভোরের ট্রেনে সে বর্ধমান জেলে গোপীনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেল। তার উদ্দেশ্য শুনে জেলার খুশী হয়ে অনুমতি দিলেন।

রাধানাথপুরে ফিরে এসেই হংসেশ্বরের কাছে গিয়ে বংশীধর বলল, কাকাবাবু, ভাববেন না, আপনার মোষ যাতে খায় তার ব্যবস্থা আমি করছি। হংসেশ্বর বললেন, ব্যবস্থাটা কি রকম শুন্নি? তুমি ওকে খাওয়াতে গেলেই তো গুঁতিয়ে দেবে। —আমি নয়, আপনিই ওকে খাওয়াবেন। গোপীরামের সঙ্গে দেখা করে আমি সব হদিস জেনে নিয়েছি। ব্যাপার হচ্ছে এই — মোষটাকে খাওয়াবার সময় গোপীরাম তার গায়ে হাত বুলিয়ে একটা গান গাইত। সেই গানটি না শুনলে রাজমহিষীর আহারে রুচি হয় না। —এ তো বড় অদ্ভুত কথা। —আজ্ঞে, রুশ বিজ্ঞানী প্যাভলভ একেই বলেছেন কন্ডিশন্ড্ রিফ্লেক্স। আপনাকে গানটি শিখে নিতে হবে। হংসেশ্বর বললেন, গান-টান আমার আসে না। যাই হোক, গানটা কি শুন্নি? বংশীধর বলল, কাকাবাবু, আমারও একটা কন্ডিশন আছে। আগে কবুল করুন — মোষ যদি আগের মতন খায় তবে আমাকে খুব মোটা বকশিশ দেবেন। —কি চাও তুমি? চকোরীর সঙ্গে বিয়ে? —চকোরীর কথা পরে হবে। আপনার তিনখানা বাড়ি আমাকে দেবেন, ব্র্যাবোর্ন রোডের সেই আটতলাটা, চৌরঙ্গীর ছতলাটা, আর সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর তেতলাটা। —ওঃ, তোমার আস্পর্ধা তো কম নয় ছোকরা! ওই তিনটে বাড়ি থেকে মাসে আমার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আসে তা জান? —আজ্ঞে জানি বইকি। কিন্তু ওর কমে তো পারব না কাকাবাবু। ওই আয় যখন আমার হবে তখন চকোরীর সঙ্গে বিয়ে দিতে আপনার আর আপত্তি থাকবে না। আপনারও কিছু সুবিধে হবে, ইনকম ট্যাক্স আর ওয়েলথ ট্যাক্স কম লাগবে। —তুমি এত বড় শয়তান তা জানতুম না। যাই হোক, যখন অন্য উপায় নেই তখন তোমার কথাতেই রাজী হলুম। রাজমহিষী যদি পেট ভরে খায় তবে তোমাকে ওই তিনটে বাড়ি দেব। কিন্তু যদি না খায় তবে তুমি এ বাড়ির ত্রিসীমায় আসবে না। —যে আজ্ঞে। —কথা তো দিলুম, এখন গানটা কি শুন্নি? —আজ্ঞে, শোনাতে লজ্জা করছে, গানটা ঠিক ভদ্র সমাজের উপযুক্ত নয় কিনা। কিন্তু অন্য উপায় তো নেই, আমার কাছেই আপনাকে শিখে নিতে হবে। গোপীরামের গানটা হচ্ছে—

সোনামুখী রাজভইংসী পাগল করেছে
জাদু করেছে রে হামায় টোনা করেছে।
ঝমে ঝমে ঝঝয় ঝয়, ঝমে ঝমে ঝয়।

—ও আবার কি রকম গান?

—গানটার একটু ইতিহাস আছে। গোপীরাম আগে দারভাঙ্গায় থাকত। সেখানে একটা পাগল বাঙালীদের বাড়ির সামনে ওই গানটা গাইত, তবে তার প্রথম লাইনটা একটু অন্য রকম—সোনামুখী বাঙালিনী পাগল করেছে। এই গান শুনলেই বাড়ির লোক দূর দূর করে পাগলটাকে তাড়িয়ে দিত। গোপীরাম সেই গানটা শিখে এসেছে, শুধু বাঙালিনীর জায়গায় রাজভইংসী করেছে। আপনি আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতে শিখুন, আজ রাত দশটা পর্যন্ত রিহার্সাল চলুক।

অত্যন্ত অনিচ্ছায় রাজী হয়ে হংসেশ্বর গানটা শেখবার চেষ্টা করতে লাগলেন।

বংশীধর বার বার সতর্ক করে দিল—রাজমহিষী নয় কাকাবাবু, বলুন রাজভইংসী, আমায় নয়, বলুন হামায়। উচ্চারণটা ঠিক গোপীরামের মতন হওয়া দরকার। হাঁ, এইবার হয়ে এসেছে। আর ঘণ্টাখানিক গলা সাধলেই সুরটি আয়ত্ত হবে।

সকাল বেলা হংসেশ্বর বললেন, দেখ বংশী, রাজমহিষীকে খাওয়াবার সময় তুমি আমার পিছনে থেকে প্রম্পট করবে, আমার সঙ্গে থাকলে তোমাকে গর্তিয়ে দেবে না। আর একটা কথা—শুধু তুমি আর আমি থাকব, আর কেউ থাকলে আমি গাইতে পারব না।

বংশীধর বলল, ঠিক আছে, অন্য কারও থাকবার দরকারই নেই।

দু বালতি রাজভোগ বংশীধর রাজমহিষীর জন্যে বয়ে নিয়ে গেল, হংসেশ্বর তা গামলায় ঢেলে দিলেন। বংশীধর পিছনে গিয়ে বলল, কাকাবাবু, এইবার গানটা ধরুন।

মোযের পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে হংসেশ্বর মধুর স্বরে বললেন ; লক্ষ্মী সোনা আমার, পেট ভরে খাও, নইলে গায়ে গতি লাগবে কেন, দুধ আসবে কেন, সেই মুলতানীটা যে তোমাকে হারিয়ে দেবে। হ হ হ—

সোনামুখী রাজভইংসী পাগল করেছে,
জাদু করেছে রে হামায় টোনা করেছে—

মোষ ফোঁস করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। বংশীধর ফিসফিস করে বলল, থামবেন না কাকাবাবু, বেশ দরদ দিয়ে বার বার গাইতে থাকুন, শেষ লাইনের সুরে ভুল করবেন না, ঝমে ঝমে ঝয় ঝয় ঝমে ঝমে ঝয়—নিনি ধাপপা পা মা মাগগা গা রে সা।

তাল-মান-লয় ঠিক রেখে হংসেশ্বর তিনবার গানটা শেষ করলেন, তার পর চতুর্থবার ধরলেন—সোনামুখী রাজভইংসী ইত্যাদি।

সহসা মোষ মাথা নামিয়ে গামলায় মুখ দিল। তার পর সেই নির্জন প্রাঙ্গণের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মৃদু মৃদু আওয়াজ উঠল—চবং চবং চবং। রাজমহিষী ভোজন করছেন।

পরবর্তী ঘটনাবলী সবিস্তারে বলবার দরকার নেই। পনেরো দিনের মধ্যেই রাজ-মহিষীর বপু গজেন্দ্রাণীর তুল্য হল, গায়ে স্বল্প লোমের ফাঁকে ফাঁকে নিবিড় আলতা-কালির রঙ ফুটে উঠল, বিপুল পয়োধর থেকে প্রত্যহ পঁচিশ সের দুধ বেরুতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গ-গবাদি-পশু-প্রদর্শনীতে সে মহিম বাঁড়ুজ্জের মুলতানী এবং অন্যান্য প্রতিযোগিনীদের অনায়াসে হারিয়ে দিল। রাজ্যপালী তার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিলেন, কৃষিমন্ত্রী সন্তর্পণে এক ছড়া রজনীগন্ধার মালা তার গলায় পরিয়ে দিলেন। রাজমহিষী প্রসন্ন হয়ে সেই অর্ঘ্যটি গ্রহণ করে চিবুতে লাগল।

বংশীধরের নতুন আবদার শুনে হংসেশ্বর বললেন, আবার চাকরির শখ হল কেন? আমার বুকে বাঁশ দিয়ে তো যত পেরেছ বাগিয়ে নিয়েছ।

বংশীধর বলল, আজ্ঞে, একটা ভাল পোস্ট না পেলে যে আমার সেলফ-রেস্পেক্ট থাকবে না। লোকে বলবে, ব্যাটা শ্বশুরের বিষয় পেয়ে নবাবি করছে।

১৮৭৯ শক (১৯৫৭)

(একটি ইংরেজী গল্পের প্লটের অনুসরণে। লেখকের নাম মনে নেই।)

সোমনাথের বউ উমা আসন্নপ্রসবা। পাশের ঘরে ডাক্তার নার্স ধাই মোতায়েন আছে। বাইরের বসবার ঘরে শুভাকাঙ্ক্ষী স্বজনবর্গ অপেক্ষা করছে, উমা আর সোমনাথ দুজনেরই ইচ্ছে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবামাঞ্জ যেন সকলের আশীর্বাদ পায়। সোমনাথ অস্থির হয়ে এ ঘর ও ঘর করে বেড়াচ্ছে। ডাক্তার বার বার তাকে বোঝাচ্ছেন, অত উতলা হচ্ছেন কেন, হলেই বা প্রথম পোয়াতি, আপনার স্ত্রীর স্বাস্থ্য তো বেশ ভালই, কিছুমাত্র চিন্তার কারণ নেই।

সন্ধ্যা সাড়ে সাত। উদীয়মান জ্যোতিঃসম্রাট তারক সান্যাল তার হাতঘড়ি দেখে বলল, রেডিওর সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছি, করেক্ট টাইম। যদি ঠিক আটটা পাঁচ মিনিটে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তবে সে রাজচক্রবর্তী হবে। ডাক্তারের উচিত ততক্ষণ ছেলেকে ঠেকিয়ে রাখা।

নাস্তিক ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, যত সব গাঁজা। তোমাদের জ্যোতিষ তো আগাগোড়া ভুল, জন্মক্ষণ ঠিক করেই বা কি হবে? যে আসছে সে তোমার কথা শুনবে না, ডাক্তারের বাধাও মানবে না, নিজের মর্জিতে যথাকালে বেরিয়ে আসবে। আর, ছেলে হবে তাই বা ধরে নিচ্ছ কেন?

—নির্ঘাত ছেলে হবে। আমি সোমনাথের বউএর কররেখা দেখেছি, তা ছাড়া খনার ফরমুলা কষে ভাগশেষ এক পেয়েছি—একে সূত দুই এ সূতা তিন হইলে গর্ভ মিথ্যা।

সোমনাথ হঠাৎ ছুটে এসে মাথার চুল টেনে বলল, ওঃ, আর তো যন্ত্রণা দেখতে পারি না। কি পাপই করেছি, আমার জন্যেই এত কষ্ট পাচ্ছে।

সোমনাথের ভগিনীপতি পাঁচুবাবু বললেন, তোমার মুণ্ডু। পাপ কিছু কর নি, মানবধর্ম পালন করেছ, বউকে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছ। না দিলে চিরকাল গঞ্জনা খেতে। তবে হাঁ, যদি তাকে তিন বারের বেশী আঁতুড় ঘরে পাঠাও তবে তোমাকে বর্বর স্বার্থপর সমাজদ্রোহী বলব। কুইন ভিক্টোরিয়ার যুগ আর নেই, গণ্ডা গণ্ডা সন্তানের জন্ম দিলে দেশের লোক কৃতার্থ হবে না।

পণ্ডিত হরিবন্দু সত্যার্থী বললেন, ওহে সোমনাথ, বউমাকে জম্ভলার নাম নিতে বল। অস্তি গোদাবরীতীরে জম্ভলা নাম রাক্ষসী, তস্যাঃ স্মরণমাত্রেণ গর্ভিণী বিশল্যা ভবেৎ। অর্থাৎ গোদাবরীর তীরে জম্ভলা রাক্ষসী থাকে, তার নাম স্মরণ করলেই গর্ভিণীর যন্ত্রণা দূর হয়ে সুপ্রসব হয়।

তারক জ্যোতিষী বলল, এখন নয়, আটটা বেজে তিন মিনিটের সময় জম্ভলার নাম নিতে বলবেন। কাল সকালেই আমি কোষ্ঠী গণনায় লেগে যাব, প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য সিদ্ধান্ত, ভৃগু আর র‍্যাডিক্যাল, দুটোরই সমন্বয় করব, প্রাচীন নবগ্রহ আর আধুনিক ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো কিছুই বাদ দেব না। দেখে নেবেন আমার ভবিষ্যৎ গণনা কি নির্ভুল হবে।

পাঁচুবাবু বললেন, ভবিষ্যৎ তো পরের কথা, সন্তানের বর্তমান হালচাল কিছু বলতে পার? —না বর্তমান আমার গণ্ডির বাইরে, আমার কারবার শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে। হরিবিক্রু সত্যার্থী বললেন, গীতায় আছে, জীবের শুধু মধ্য অবস্থা অর্থাৎ জীবিতাবস্থাই আমরা জানতে পারি, তার পূর্বে কি ছিল এবং মরণের পরে কি হবে তা অব্যক্ত। সোমনাথের সন্তান এখন অতীত আর বর্তমানের সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এ সম্বন্ধে আমাদের শাস্ত্রে যা আছে বলছি শুনুন। পরলোকবাসী মানবাত্মার পাপ-পুণ্যের ফলভোগ যখন সমাপ্ত হয় তখন সে মর্ত্যলোকে পতিত হয় এবং মেঘে প্রবেশ করে জলময় রূপ পায়। সেই জল বৃষ্টি রূপে পদ্ম পুষ্প ফল মূল ওষধি বনস্পতিতে সঞ্চারিত হয় এবং তা ভক্ষণের ফলে নরনারীর দেহে শুক্র ও শোণিত উৎপন্ন হয়। গর্ভাধানকালে শুক্রের আধিক্যে পুরুষ, শোণিতের আধিক্যে স্ত্রী, এবং উভয়ের সমতায় ক্লীবের সৃষ্টি হয়। জরায়ুমধ্যস্থ ভ্রূণ প্রথম দিনে পঙ্কতুল্য, পাঁচ দিনে বুদ্বুদ্, সাত দিনে পেশী, এক পক্ষে অর্বুদ, পঁচিশ দিনে ঘন, এবং এক মাসে কঠিন আকার পায়। দুই মাসে মস্তক, তিন মাসে গ্রীবা, চার মাসে ত্বক, পাঁচ মাসে নখ ও রোম, ছয় মাসে চক্ষু কর্ণ নাসা আর মুখের সৃষ্টি হয়। সপ্তম মাসে ভ্রূণ স্পন্দিত হয়, অষ্টম মাসে বুদ্ধি যোগ হয়, এবং নবম মাসে সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পূর্ণতা পায়। জন্মের পরেই শিশুর অনুভূতি হয়। তার পর সে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, প্রাক্তন কর্ম অনুসারে সংসারে সুখদুঃখ ভোগ করে, এবং মৃত্যুর পরে পুনর্বার দেহান্তর পায়। পাঁচুবাবু বললেন, ওহে প্রফেসর অনাদি, তোমাদের শাস্ত্রে কি বলে? বায়োলজিষ্ট অনাদি রায় বললেন, সত্যার্থী মশায় নেহাত মন্দ বলেন নি। আমরা যা জানি তা বলছি শুনুন। প্রথমে দুটি অতি ক্ষুদ্র কোষের সংযোগ, তা থেকে ক্রমশঃ অসংখ্য কোষের উৎপত্তি, তারই পরিণাম এই মানবদেহ। প্রথম কয়েক মাস ভ্রূণকে মানুষ বলে চেনা যায় না, মনে হয় মাছ টিকটিকি বা বিড়ালছানা। কোটি কোটি বৎসরে মানুষের যে ক্রমিক রূপান্তর হয়েছে, জরায়ুস্থ ভ্রূণ যেন তারই পুনরভিনয় করে। চার-পাঁচ মাসে তার চেহারা মানুষের মতন হয়, সে হাত-পা নাড়ে, মাঝে মাঝে মাথা দিয়ে গর্ভধারিণীকে গুতৈ মারে, হয়তো আঙুলও চোষে। গর্ভবাসকালে সে শ্বাস নেয় না, কিন্তু দেড় মাসের হলেই ভ্রূণের বুক ধকধক করতে থাকে। পুষ্টির জন্যে যা দরকার সবই তার মায়ের রক্ত থেকে ফুল বা প্লাসেন্টার মধ্যে ফিলটার হয়ে গর্ভনাড়ী দিয়ে ভ্রূণের দেহে প্রবেশ করে। জরায়ুস্থ তরল পদার্থের মধ্যে সে যেন জলচর প্রাণী রূপে বাস করছিল, ভূমিষ্ঠ হয়েই সে হঠাৎ স্থলচর হয়ে যায়। দু-এক মিনিটের মধ্যেই সে শ্বাস নেবার চেষ্টা করে, খাবি খেয়ে কেঁদে ওঠে, নাক মুখ দিয়ে লালা বার করে ফেলে। নবজাত মনুষ্যশাবক লম্বায় এক হাতের কম, ওজনে প্রায় সাড়ে তিন সের, মাথা বড়, পেট লম্বা, হাত-পা ছোট ছোট। মা বাপ ভাই বোনের সঙ্গে তার চেহারার যতই মিল থাকুক, সে একজন স্বতন্ত্র অদ্বিতীয় মানুষ। প্রথম কয়েক মাস সে সমবয়সী ছাগলছানার চাইতেও অসহায়, কিন্তু তার পর তার শক্তি আর বুদ্ধি ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। হরিবিক্রু সত্যার্থী বললেন, অনাদিবাবু শুধু স্থূল দেহের উৎপত্তির বিবরণ দিলেন, কিন্তু মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার আর আত্মার কথা তো বললেন না। অনাদি রায় বললেন, ও সব কিছুই জানি না সত্যার্থী মশায়, বলব কি করে?

৬৬১

সোমনাথ কান খাড়া করে ছিল, হঠাৎ একটা অস্ফুট আর্তনাদ শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল। তারক সান্যাল তার হাত-ঘড়িতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রইল। আর সকলে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তার পর হঠাৎ আওয়াজ এল—ওয়াঁ ওয়াঁ।

তারক জ্যোতিষী বলল, আটটা বেজে তিন মিনিট, আহাহা, আর দু মিনিট পরে হলেই খাসা হত। যাই হোক, আমার গণনায় ভুল হয় নি, পুত্র সন্তানই হয়েছে।

ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, তা তুমি জানলে কি করে?

—ওই যে, হুলো বেড়ালের মতন ডেকে উঠল। মেয়ে হলে উঁয়া উঁয়া করত।

কবি শ্রীকণ্ঠ নন্দী এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এখন বললেন, তারকবাবুর কথা ঠিক। কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, জনক রাজা লাঙল চালাতে চালাতে হঠাৎ দেখলেন মাটিব ঢেলা থেকে ছোট্ট একটি মেয়ে বেরিয়েছে, 'উঙা উঙা করি কান্দে যেন সৌদামিনী।'

ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, তারকের মতন গদগদ বলতে সবাই পারে। হয় ছেলে না হয় মেয়ে, এই দুটোর মধ্যে একটা যদি বাই চান্স মিলে যায় তাতে বাহাদুরিটা কি?

সোমনাথের ভাগনী তোতা শাঁখ বাজাতে বাজাতে এসে বলল, মামীর খোকা হয়েছে, এই অ্যাথো বড়, গোলাপ ফুলের মতন লাল টুকটুকে।

পাঁচুবাবু বললেন, লাল টুকটুকে রঙ একমাসের মধ্যেই নবঘনশ্যাম হয়ে যাবে। তোর মামা কি করছে রে?

—নার্স বলছে চলে যেতে কিন্তু মামা ঘর থেকে নড়বে না, খালি খালি ছেলের দিকে চেয়ে আছে।

—হুঁ। প্রথম যখন ছেলে হল ভাবলুম বাহা বাহা রে, সোমনাথের সেই দশা হয়েছে। আর দেরি করে কি হবে, আমাদের আশীর্বাদটা এখনই সেরে ফেলা যাক। সোমনাথকে ডাকবার দরকার নেই, পরে জানিয়ে দিলেই চলবে। সে এখন পুত্রের চন্দ্রমুখ নিরীক্ষণ করতে থাকুক। সত্যার্থী মশায়, আপনিই আরম্ভ করুন।

গলায় খাঁকার দিয়ে হরিবিক্রম সত্যার্থী সুর করে বলতে লাগলেন— ফলং পবিত্ৰং জননী কৃতাৰ্থা বসুন্ধরা পুণ্যবতী চ তেন। অপারসংবিৎসুখসাগরেহস্মিন্ লীনং পরে ব্রহ্মণি যস্য চেতঃ।।

এই নবকুমার স্বাস্থ্যবান বিদ্যাবান ধর্মপ্রাণ হয়ে বেঁচে থাকুক, পরম জ্ঞান লাভ করুক, পরব্রহ্ম রূপ অপারসংবিৎসুখসাগরে তার চিত্ত লীন হক, তাতেই তার কুল পবিত্র হবে, জননী কৃতার্থা হবেন, বসুন্ধরা পুণ্যবতী হবেন। এর চাইতে বড় আশীর্বাদ আমার জানা নেই।

পাঁচুবাবু হাত নেড়ে বললেন, এ কি রকম বেয়াড়া আশীর্বাদ করলেন সত্যার্থী মশায়! সোমনাথের ছেলের চিত্ত যদি পরব্রহ্মে লীন হয়ে যায় তবে তার আর রইল কি? ওর বাপ মা আত্মীয় স্বজন যে মহা ফ্যাসাদে পড়বে।

হরিবিক্রম সত্যার্থী বললেন, বেশ তো, আপনি নিজের মনের মতন একটি আশীর্বাদ করুন না।

পাঁচুবাবু বললেন, শুনুন। আশীর্বাদ করি, এই ছেলে সুস্থ দেহে দিন দিন বাড়তে থাকুক, বেশী অসুখে ভুগে যেন বাপ-মাকে না জ্বালায়। সুন্দর সবল খোকা

হয়ে বালগোপালের মতন উপদ্রব করুক, যথাকালে লেখাপড়া শিখুক, ভাল রোজগার করুক, প্রেমে পড়ে বিয়ে করুক কিংবা বিয়ে করে প্রেমে পড়ুক। সে তেজস্বী বীর- পুরুষ হক। গুণ্ডা হতে বলছি না, কিন্তু এক চড়ের বদলে তিন চড় যেন ফিরিয়ে দিতে পারে, দরকার হলে সে যেন দশের জন্যে লড়তে পারে, উড়তে পারে, জাহাজ চালাতে পারে। সে যেন অলস বিলাসী হুজুগে না হয়, নাচ গান আর সিনেমা নিয়ে না মাতে, চোর ঘুষখোর মাতাল লম্পট না হয়। বহু লোককে সে প্রতিপালন করুক, প্রচুর উপার্জন করে জনহিতার্থে ব্যয় করুক, কিন্তু বেশী টাকা জমিয়ে রেখে যেন বংশধরদের মাথা না খায়। তার অসংখ্য বন্ধু হক, গোটাকতক শত্রুও হক, নইলে সে আত্মগর্বী হয়ে পড়বে। সে সাহিত্য বিজ্ঞান দর্শন কর্মযোগ জ্ঞানযোগ ভক্তিযোগ যত খুশি চর্চা করুক, কিন্তু যেন বুদ্ধ যিশু শংকর আর শ্রীচৈতন্যের মতন সংসার- ত্যাগী না হয়। তার মহাপুরুষ পরমপুরুষ বা অবতার হবার কিছুমাত্র দরকার নেই! তবে হাঁ বঙ্কিমচন্দ্র কাটছাঁট করে যে রকম bowdlerized নির্দোষ সর্বগুণান্বিত আদর্শ পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ খাড়া করেছেন সে রকম যদি হতে পারে তাতে আমাদের আপত্তি নেই। মোট কথা আমরা চাই সোমনাথের ব্যাটা একজন মান্য গণ্য স্বনামধন্য চৌকশ পরিপূর্ণ পুং পুরুষ হয়ে উঠুক, যাকে বলে hundred per cent he-man।

ভুজঙ্গ ভঞ্জ বলল, পাঁচু-দা ভালই বলেছেন, তবে ওঁর আশীর্বাদে বুর্জোয়া ভাব প্রকট হয়েছে। প্রজার ভাগ্য আর রাষ্ট্রের ভাগ্য এক সঙ্গে জড়িত, রাষ্ট্রের সংস্কার না হলে প্রজার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হতে পারে না। অতএব রাষ্ট্র আর প্রজা দুইএরই মঙ্গল- কামনায় আমি বলছি—এই সদ্যোজাত ভারত-সন্তান যেন এমন শাসনতন্ত্রের আশ্রয় পায় যা তাকে সর্বাত্মক শিক্ষা দেবে, তার সামর্থ্যের উপযুক্ত কর্ম দেবে, তার প্রয়োজনে উপযুক্ত জীবিকার ব্যবস্থা করবে, সে যেন কায়মনোবাক্যে রাষ্ট্রবিধির বশবর্তী হয়, তার চিত্ত পরব্রহ্মে লীন না হয়ে যেন রাষ্ট্রেই লীন হয়। সে যেন বোঝে, সে রাষ্ট্রেরই একটি অবয়ব, হাত পা প্রভৃতির মতন সেও এক বিরাট মস্তিষ্কের অধীন, তার স্বাতন্ত্র্য নেই।

পাঁচুবাবু বললেন, তুমি বলতে চাও এই শিশু রাষ্ট্রদাস হয়ে জন্মেছে, চিরকাল রাষ্ট্রদাস হয়েই থাকবে। তার নিজের মতে চলবার বা আপত্তি জানাবার অধিকার নেই যত অধিকার শুধু রাষ্ট্রের বিরাট মস্তিষ্ক অর্থাৎ চাঁইদেরই আছে। ওসব চলবে না বাপু, সোমনাথের অপত্য কর্তাভজা হয়ে কলের পুতুলের মতন হাত পা নাড়বে কিংবা পিপঁড়ে মৌমাছির মতন বাঁধাধরা সংস্কারের বশে একঘেয়ে জীবনযাত্রা নির্বাহ করবে তা আমরা চাই না। ওহে শ্রীকণ্ঠ কবি, তোমার কণ্ঠ নীরব কেন? তুমিও একটি আশীর্বাণী বল।

শ্রীকণ্ঠ নন্দী বললেন, বলবার অবসর পাচ্ছি কই? স্বর্গ থেকে একটি শিশু অব- তীর্ণ হয়েছে, তাকে আদর করে ঘরে তুলবেন, তা নয়, শুধু বায়োলজি ব্রহ্মনির্বাণ সমাজতত্ত্ব আর রাজনীতির কচকচি। আসুন আমরা নবজাতককে অভিনন্দন জানাই, মহাত্মা কবীর যেমন তাঁর পুত্র কামালকে পেয়ে বলেছিলেন তেমনি সোমনাথের হয়ে আমরাও বলি— অজব মুসাফির ঘর মে আয়া ধরো মঙ্গল থাল, উজ্জর বংশ কবীর কা উপজে পুত কামাল।

—আশ্চর্য পথিক ঘরে এসেছে, মঙ্গল থাল ধরে তাকে বরণ কর; কবীরের বংশ উজ্জ্বল হল, পুত্র কামাল জন্মেছে। অথবা টেনিসনের মতন উদাত্ত কণ্ঠে সম্ভাষণ করুন—

Out of the deep, my child, out of the deep, From that great deep, before our world begins, Whereon the spirit of God moves as he will... From that true world within the world we see, Whereof our world is but the bounding shore... With this ninth moon, that sends the hidden sun Down yon dark sea, thou comest, darling boy. কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতন বলুন— সব দেবতার আদরের ধন, নিত্য কালের তুই পুরাতন, তুই প্রভাতের আলোর সমবয়সী। তুই জগতের স্বপ্ন হতে এসেছিস আনন্দস্রোতে— গরুচোরের মতন সলজ্জ মুখে সোমনাথ ঘরে এসে বলল, চা করতে বলি? তার সঙ্গে কচুরি আর রসগোল্লা? পাঁচুবাবু বললেন, রাম বল। তোমার তো এখন জাতাশৌচ, এ বাড়ির কোনও জিনিস আমাদের খাওয়া চলবে না, কি বলেন সত্যাৰ্থী মশায়? এক মাস কাটুক, তোমার বউ চাঙ্গা হয়ে উঠুক, তার পর খোকাকে কোলে নিয়ে আমাদের যত ইচ্ছে হয় পরিবেশন করবে। তোতা বলল, বা রে, খোকাকে কোলে নিয়ে বুঝি পরিবেশন করা যায়! —আচ্ছা আচ্ছা, খোকা না হয় তোর মামার কোলে থাকবে। —আর যদি মামার— —তা হলে তোর মামার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার হয়ে যাবে।

১৮৭৯ শক (১৯৫৭)